শিশুদের জন্য নৈতিক শিক্ষা ইসলামিক গল্পের পঞ্চম পর্বে রয়েছে ৪১–৫০ নম্বর গল্প। গল্পে গল্পে আপনার ছোট্ট আদরের সোনামনিদের-কে নৈতিক শিক্ষা দিতে এই ইসলামিক গল্পগুলো আপনাকে সহায়তা করতে পারে। শিশুরা ঘুমানোর সময় কিংবা বিকেলের আড্ডায় গল্প শুনতে বেশ আগ্রহী, তখন এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে আপনি তাদের হৃদয়ে নৈতিক শিক্ষার আলোর জ্বালিয়ে দিতে পারেন। এই নৈতিক শিক্ষার গল্প সমূহ তাদেরকে পড়ে শোনান এবং নিম্মোক্ত প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করে দেখুন সে কি উত্তর দেয়! তাহলে চলুন আর দেরি না করে আমরা গল্পের ভিতরে ডুব দেয়!

সূচিপত্র 📚 শিশুদের ইসলামিক নৈতিক গল্প – পর্ব ৫
- ৪১. চার ষাঁড়ের গল্প
- ৪২. দু’আর জোর
- ৪৩. দুশ্চিন্তা কিসের?
- ৪৪. সিদ্ধান্ত নিতে জলদিবাজি
- ৪৫. ন্যায়পরায়ণতা
- ৪৬. শিয়াল নয়, বাঘ হও
- ৪৭. আশার নেশা
- ৪৮. গোপনীয় কথা
- ৪৯. মানুষ চেনার উপায়
- ৫০. রূপ নয়, গুণ চাই
🐂 চার ষাঁড়ের গল্প (গরুর গল্প)
একটা বনে বাস করতো চারটি গরু। তিনটি কালো, একটি সাদা। তারা এজন্য নিরাপত্তার খাতিরে একসাথে থাকত এবং একে অপরের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতো। যার ফলে তারা টিকে ছিল। একদিন কালো তিনজন একত্র হল এবং বলল এই সাদা গরুটার জন্য আমরা ধরা পড়ে যাব। আমরা কালো বলে রাতের বেলা শত্রু আমাদের দেখতে পায়না, কিন্তু তাকে দেখতে পায়। চল ঐ গরুটাকে আমরা পরিত্যাগ করি। তারপর আমরা তিনজন একসাথে থাকবো। যেমন কথা তেমন কাজ। সেদিন থেকেই কালো গরুগুলো সাদাটাকে বয়কট করল, তিনজন একপাশে থাকত আর বেচারা সাদা গরুটা আরেক পাশে।
সেখানকার নেকড়ে এই গরুদের মধ্যে অনৈক্য বুঝে ফেললো এবং সে সাদা গরুটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। যখন নেকড়ে সাদা গরুটার গোশত খুলে খুলে খাচ্ছিল, তখন কালো গরুগুলো কোন বাধা দিলনা। তারা তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের ভাইকে টুকরো টুকরো হতে দেখছিল। পরের রাতে নেকড়ে কালো গরুগুলো উপর আক্রমণ করলো, কারণ তাদের শক্তি কমে গেছে। এজন্য নেকড়ে একটা কালো গরুকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলো।
পরের রাতে নেকড়ের জন্য কাজটা আরো সহজ হয়ে গেল, কারণ গরু আছেই মাত্র দুটো। নেকড়ে খুব সহজে আরেকটা গরু খেয়ে নিল। শেষ রাতে গরু বাকি রইল মাত্র একটা। গরুটা ভয়ে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করলো। কিন্তু তার কোন সাহায্যকারী নেই। নেকড়ে বুঝল গরুটা দৌড়াদৌড়ি করে হাঁপিয়ে একসময় পড়ে যাবে, তাই সে মনের আনন্দে পায়চারি করতে লাগলো। সময় সুযোগমত সে গরুটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে গরুটা একটা কথা বলেছিল, খুবই শিক্ষণীয় কথা। সে বলেছিল, “আমিতো সেদিনই খাদ্য হয়েছি, যেদিন সাদা গরুটাকে খাওয়া হয়েছে।” অর্থাৎ গরুটা বুঝতে পেরেছিল, যেদিন সে সাদা গরুটাকে সাহায্য করেনি, সেদিনই সে নিজের মৃত্যুর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
শিক্ষা: “একতায় শক্তি, একতায় বল, বিভেদে পরাজয়; হয় চিরকাল।”
📖 সারাংশ: চারটি গরু—তিনটি কালো, একটি সাদা—শ্বাপদসংকুল এলাকায় একসাথে থাকত। কালো গরুরা সাদাটিকে পরিত্যাগ করলে নেকড়ে তাদের দুর্বলতা বুঝে একে একে সবাইকে খেয়ে ফেলে। শেষ গরুটি মৃত্যুর আগে বলে, “আমিতো সেদিনই খাদ্য হয়েছি, যেদিন সাদা গরুটাকে খাওয়া হয়েছে।”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: একতাই শক্তি, বিভেদে দুর্বলতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়ানো না গেলে, একদিন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- কালো গরুরা সাদা গরুটিকে কেন পরিত্যাগ করেছিল?
- নেকড়ে কীভাবে তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়েছিল?
- শেষ গরুটি মৃত্যুর আগে কী বলেছিল?
“একতায় শক্তি, একতায় বল,
বিভেদে পরাজয়; হয় চিরকাল।”
৪২. 🙏 দু’আর জোর
এক দরবেশ এক চাকি-ওয়ালার নিকট এসে বলল, আমার গমগুলো
তাড়াতাড়ি পিষে দাও।
চাকি-ওয়ালা বলল, আমি দুঃখিত যে, আপনার আগে যে সব লোক লাইনে আছে, তারাই আগে পাওয়ার অধিকারী। অতএব তাদের আগে হোক, তারপর যথাক্রমে আপনারও হবে।
দরবেশটি বলল, তাহলে আমিও দুঃখিত যে, আমি এমন এক দু’আ করব, যাতে তোমার ঐ চাকি ঘুরানোর আসল গাধাটাই ধ্বংস হয়ে যায়; যার দ্বারা তুমি আটা পিষে রোযগার করে খাচ্ছ।
চাকি-ওয়ালা বলল, তাহলে আপনার দু’আ কি মকবুল? দরবেশ বলল, নিশ্চয়। চাকি-ওয়ালা বলল, তাহলে আপনি আল্লাহর কাছে এই দু’আ করেন না, যাতে আপনার গমগুলো সত্বর আটাতে পরিণত হয়ে যায়।
📖 সারাংশ: এক দরবেশ চাকি-ওয়ালাকে বলেন, “আমার গমগুলো আগে পিষে দাও।” চাকি-ওয়ালা বলেন, “আপনার আগে যারা এসেছে, তাদের কাজ আগে হবে।” দরবেশ রাগ করে বলেন, “আমি এমন দু’আ করব যাতে তোমার গাধা ধ্বংস হয়ে যায়।” চাকি-ওয়ালা বলেন, “আপনার দু’আ যদি মকবুল হয়, তাহলে আপনি এমন দু’আ করুন যাতে আপনার গমগুলোই তাড়াতাড়ি আটাতে পরিণত হয়।”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: দোয়া আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার মাধ্যম। ক্ষতির জন্য দোয়া করা উচিত নয়। ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- দরবেশ কেন রাগ করেছিল?
- চাকি-ওয়ালা কীভাবে দরবেশকে যুক্তি দিয়ে বোঝাল?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি দোয়ার ব্যবহার সম্পর্কে?
দোয়া হোক কল্যাণের জন্য,
ক্ষতির নয়, হোক হৃদয়ের আলোয়।
৪৩. 🧘♂️ দুশ্চিন্তা কিসের?
একদা ইব্রাহীম বিন আদহাম এক দুশ্চিন্তাগ্রস্থ লোকের নিকট গিয়ে বললেন,
: আমি তোমাকে ৩টি প্রশ্ন করব, তার উত্তর দেবে কি?
: লোকটি বলল, অবশ্যই।
: তিনি বললেন, এ জগতে কি এমন কিছু ঘটছে, যাতে আল্লাহর ইচ্ছা নেই?;
: সে বলল, জী না।
: তিনি বললেন, তোমার রূযীর এতটুকু কি কম হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন?
: সে বলল, জী, না।
: তিনি বললেন, তোমার আয়ু থেকে কি এতটুকুও কম করা হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন?
: সে বলল, জী, না।
: তিনি বললেন, তবে আবার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ কিসের?
📖 সারাংশ: ইব্রাহীম বিন আদহাম এক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোককে তিনটি প্রশ্ন করেন: (১) আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছু ঘটে কি? (২) রূযী কমে যাবে কি? (৩) আয়ু কমে যাবে কি? লোকটি তিনবারই “না” বলে। তখন তিনি বলেন, “তবে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ কিসের?”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: আল্লাহর উপর ভরসা করলে দুশ্চিন্তার জায়গা থাকে না। রূযী, আয়ু ও ঘটনা সবই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তাই শান্ত থাকাই ঈমানের পরিচয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- ইব্রাহীম বিন আদহাম কী তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন?
- লোকটি কী উত্তর দিয়েছিল?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি দুশ্চিন্তা সম্পর্কে?
যার ঈমান আল্লাহর উপর,
তার হৃদয় থাকে শান্ত, নির্ভরতায় ভরপুর।
৪৪. ⚖️ সিদ্ধান্ত নিতে জলদিবাজি
এক দম্পতি জঙ্গলের ধারে বাস করত। ছোট শিশু রেখে স্ত্রী মারা গেল। স্বামী কাজে গেলে শক্তিশালী পোষা কুকুর শিশুটিকে পাহারা দিত। একদিন কাজ থেকে ফিরে এসে দেখল কুকুরটির মুখে রক্ত এবং সে বাইরে বসে অপেক্ষা করছে। ভাবল, সে তার ছেলেকে হত্যা করেছে। ফলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে পিস্তলের গুলি দিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলল । অতঃপর ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখল। ছেলে বহাল তবিয়তে খেলা করছে এবং পাশে নেকড়ে বাঘের লাশ পড়ে আছে।
প্রকৃত তত্ত্ব না জানার আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে কত বড় সর্বনাশ করল সে!
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি তার শিশুকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে পোষা কুকুর রেখে কাজে যেত। একদিন ফিরে এসে কুকুরের মুখে রক্ত দেখে ভাবল, সে হয়তো শিশুকে মেরে ফেলেছে। রাগে কুকুরকে গুলি করে মেরে ফেলে। পরে ঘরে গিয়ে দেখে, শিশু নিরাপদে খেলছে আর পাশে নেকড়ে বাঘের মৃতদেহ পড়ে আছে।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। সত্য যাচাই না করে কাজ করলে বড় ক্ষতি হতে পারে। ধৈর্য ও বিবেচনা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- লোকটি কেন কুকুরকে হত্যা করেছিল?
- আসলে কুকুরটি কী করেছিল?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?
আবেগ নয়, চাই বিবেচনা,
না বুঝে করলে হয় সর্বনাশের বুনন।
৪৫. ⚖️ ন্যায়পরায়ণতা
ন্যায়পরায়ণতায় মনে শান্তি ও দেহে নিরাপত্তা লাভ হয়। হযরত উমার (রাঃ) এর নিকট কাইসার এক দূত পাঠাল। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর অবস্থা, কর্ম ও রাজ্য-পরিস্থিতি পরিদর্শন করা। দূত মদীনায় প্রবেশ করে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করল, তোমাদের রাজা কোথায়?
লোকেরা বলল, আমাদের কোন রাজা নেই। অবশ্য আমাদের আমীর (নেতা) আছেন। আর তিনি এখন মদীনার উপকণ্ঠে বের হয়ে গেছেন।
দূত তাঁর খোঁজে বের হয়ে গেল। কিছু পরে তাঁকে দেখতে পেল, তিনি বালির উপর দুর্রাকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছেন! তাঁর অবস্থা দর্শন করে দূতের হৃদয় নম্র হল ও মনে মনে বলল, এমন এক মানুষ, যাঁর আতঙ্কে সমস্ত রাজাদের কোন সিদ্ধান্ত স্থির হয় না, তাঁর অবস্থা এই?
আসলে হে উমার! আপনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাই এইভাবে ঘুমাতে পেরেছেন। আর আমাদের রাজা অন্যায় করে, যার ফলে সে সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থেকে অনিদ্রায় কাল কাটায়।
📖 সারাংশ: হযরত উমার (রাঃ)-এর অবস্থা জানতে কাইসার এক দূত মদীনায় আসে। সে জানতে চায়, “তোমাদের রাজা কোথায়?” লোকেরা বলে, “আমাদের রাজা নেই, আমীর আছেন।” দূত তাঁকে খুঁজে পায়—বালির উপর ঘুমিয়ে আছেন, কোনো প্রহরী নেই। দূত বিস্মিত হয়—যে মানুষকে ভয় পায় রাজারা, তিনি এত শান্তভাবে ঘুমাচ্ছেন! কারণ, তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: ন্যায়পরায়ণতা মানুষকে ভয়ের বদলে শান্তি দেয়। সত্য ও ইনসাফের পথে থাকলে আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তা আসে।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- দূত কেন হযরত উমার (রাঃ)-এর অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছিল?
- লোকেরা কেন বলেছিল, “আমাদের রাজা নেই”?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি নেতৃত্ব ও ন্যায় সম্পর্কে?
ন্যায়ের পথে চলে যে,
তার ঘুম হয় শান্ত, হৃদয় হয় নির্ভয়ে।
৪৬. 🐯 শিয়াল নয়, বাঘ হও
এক বণিক ছিল । প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল তার। কিন্তু তার একমাত্র ছেলে ছিল অকর্মণ্য কুঁড়ে। সে কোন কাজ করতে চাইত না, ব্যবসাতেও মন ছিল না। অবশেষে এক রকম জোর করে বণিক সেই ছেলেকে বাণিজ্যে পাঠাল। পথে এক ক্ষুধার্ত শিয়াল দেখল। ভাবল, এই মিসকীন কোথেকে খেতে পায়? তৎক্ষণাৎ অন্য দিকে লক্ষ্য করল, এক বাঘ শিকার ধরে খাচ্ছে। ভয়ে গাছে উঠে লুকিয়ে দেখল, সে খেয়ে চলে গেলে শিকারের অবশিষ্টাংশ শিয়াল গিয়ে খেল। মনে করল, এমনি করে তারও দিন যাবে। এত কষ্ট করে লাভ কী? বাড়ি ফিরে এসে পিতাকে খবর জানাল।
পিতা বলল, তুই ভুল বুঝেছিস। আমি আশা করি, তুই শিয়ালের অনুসরণ না করে, বাঘের অনুসরণ করবি। অর্থাৎ তুই বাঘের মত নিজে কষ্ট করে কামাই করে খাবি। আর অন্য কেউ তোর উচ্ছিষ্ট খাবে।
মানুষ যখন আশা ও কামনা করে, তখন নিচু না করে উঁচু করতে হয়।
📖 সারাংশ: এক বণিকের ছেলে ছিল অলস ও অকর্মণ্য। তাকে জোর করে ব্যবসায় পাঠানো হয়। পথে সে দেখে, এক বাঘ শিকার করে খাচ্ছে, আর পরে শিয়াল তার উচ্ছিষ্ট খাচ্ছে। সে ভাবে, “আমি শিয়ালের মতোই চলব।” বাড়ি ফিরে পিতাকে জানালে, পিতা বলেন, “তুই ভুল বুঝেছিস। শিয়াল নয়, বাঘের মতো নিজে কষ্ট করে কামাই কর। অন্যরা তোর উচ্ছিষ্ট খাক।”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: অলসতা নয়, পরিশ্রমই সফলতার চাবিকাঠি। নিজের চেষ্টা ও শ্রমেই জীবনের মর্যাদা আসে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা হোক কর্মনির্ভর।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- ছেলেটি কী দেখে শিয়ালের মতো জীবন ভাবল?
- পিতা তাকে কী পরামর্শ দিলেন?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরতা সম্পর্কে?
অলস নয়, হোক কর্মে জয়,
শিয়ালের নয়, বাঘের পথই সঠিক হয়।
৪৭. 🍯 আশার নেশা
এক আশাবাদী ব্যক্তি বাসনার বড় স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাটে যাচ্ছিল। মাথায় ছিল মাটির কলসি ভরা মধু। বড় সুখের বাসনায় সে মনে মনে পরিকল্পনা শুরু করল; বলল, মধুর কলসিটিকে ১০ দিরহামে বিক্রি করে ৫টি ছাগল কিনব। সেগুলি বছরে ২ বার বিয়াবে। ২ বছরে ২০টি ছাগল হবে।
তখন প্রত্যেক ৪টির বিনিময়ে ১টি করে (মোট ৫টি) গরু কিনব। সেখান হতে আমার অর্থ বৃদ্ধি পাবে। কিছু জমি কিনে চাষ শুরু করব। তারপর সুন্দর একটি ঘর বানাব। ঘরে দাস-দাসী রাখব।
সুন্দরী দেখে একটি বিয়ে করব। আমার ছেলে হবে, তার নাম রাখব হাবিবুল্লাহ। তাকে উত্তম আদব শিক্ষা দেব এবং ভালভাবে বুঝাব। সে আমার কথা না মানলে লাঠি মেরে শিক্ষা দেব।
লোকটির হাতে ১টি লাঠি ছিল। কীভাবে ছেলেকে মারবে, তা দেখতে গিয়ে মনের আবেগে তুলল উপরে। আঘাত লাগল মাথার উপরে মাটির কলসিতে। ভেঙ্গে গেল কলসি। মাথায় বয়ে গেল মধু। মনের আশা থেকে গেল মনের গহীন কোণেই। আসলে কোন কিছুর আশা করলেও তার নেশা হওয়াটা বড় ক্ষতিকর।
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি মাথায় মধুর কলসি নিয়ে হাটে যাচ্ছিল। পথে সে কল্পনায় ছাগল, গরু, জমি, ঘর, স্ত্রী, ছেলে—সবকিছু ভাবতে লাগল। ছেলেকে লাঠি দিয়ে শিক্ষা দেওয়ার কল্পনায় লাঠি তুলতেই কলসিতে আঘাত লাগে। কলসি ভেঙে যায়, মধু পড়ে যায়, আর সব আশা মনের গহীনে রয়ে যায়।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: অতিরিক্ত কল্পনা ও বাসনার নেশা বাস্তব ক্ষতি ডেকে আনে। পরিকল্পনা হোক বাস্তবভিত্তিক, নিয়ন্ত্রিত ও ধৈর্যপূর্ণ।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- লোকটি কী কী কল্পনা করেছিল মধুর কলসি নিয়ে?
- শেষে কী কারণে তার সব আশা ভেঙে যায়?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি আশা ও বাস্তবতা সম্পর্কে?
আশা হোক আলোর পথ,
নেশা নয়, হোক নিয়ন্ত্রিত শক্তি ও সত্য।
৪৮. 🤐 গোপনীয় কথা
বড় মানুষের সাথে গোপন কথা আর কী হবে? একদা এক ব্যক্তি আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের নিকট এসে গোপনে কিছু বলতে চাইল । তিনি বললেন, তুমি আমার প্রশংসা করবে না। কারণ আমি নিজের ব্যাপারে খুব ভালো জানি।
মিথ্যা বলবে না। কারণ, মিথ্যুকের কোন রায় নেই।
আর আমার কাছে কারো গীবত করবে না।
লোকটি বলল, তাহলে আমাকে চলে যেতে অনুমতি দিন, হে আমীরুল মুমিনীন!
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের কাছে গোপনে কিছু বলতে চায়। তিনি বলেন, “আমার প্রশংসা করো না, কারণ আমি নিজেকে ভালো জানি। মিথ্যা বলো না, কারণ মিথ্যুকের কোনো রায় নেই। আর কারো গীবত করো না।” তখন লোকটি বলেন, “তাহলে আমাকে চলে যেতে দিন, হে আমীরুল মুমিনীন!”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: সত্যবাদিতা, আত্মসম্মান এবং গীবত থেকে বিরত থাকা একজন মুসলমানের গুণ। বড়দের সামনে গোপন কথা নয়, বরং নৈতিকতা ও ভদ্রতা বজায় রাখা উচিত।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- আব্দুল মালেক কী তিনটি শর্ত বলেছিলেন?
- লোকটি কেন শেষে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইল?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি গোপন কথা ও নৈতিকতা সম্পর্কে?
সত্য বলো, গীবত নয়,
ন্যায়ের পথে থাকাই মুসলমানের পরিচয়।
৪৯. 🧠 মানুষ চেনার উপায়
এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ) কে বলল, অমুক লোকটা বড় খাঁটি
লোক।
: তিনি বললেন, তা তুমি কিভাবে জানলে? ওর সাথে কোন সময় সফর করেছ?
: লোকটি বলল, জী, না।
: তিনি বললেন, তোমার ও ওর মাঝে কোনদিন তর্ক বা মতবিরোধ হয়েছিল?
: সে বলল, জী, না।
: তিনি বললেন, ওর কাছে কোনদিন কিছু আমানত রেখেছিলে?
: সে বলল, জী, না।
: তিনি বললেন, তাহলে ওর সম্পর্কে তুমি কিছুই জান না। আমার মনে হয়, তুমি ওকে মসজিদে মাথা হিলাতে দেখেছ !
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি হযরত উমার (রাঃ)-কে বলেন, “অমুক লোকটা খুব ভালো।” তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি তার সঙ্গে সফর করেছ? তর্ক হয়েছে? কিছু আমানত রেখেছ?” লোকটি তিনবারই “না” বলে। তখন তিনি বলেন, “তাহলে তুমি কিছুই জান না। হয়তো তুমি তাকে মসজিদে মাথা হিলাতে দেখেছ!”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: মানুষকে চিনতে হলে তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। বাহ্যিক আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল হতে পারে। সম্পর্কের গভীরতা আসে সময়, পরিস্থিতি ও পরীক্ষায়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- হযরত উমার (রাঃ) কী কী প্রশ্ন করেছিলেন?
- লোকটি কেন বলেছিলেন, “অমুক লোকটা ভালো”?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি মানুষ চেনা সম্পর্কে?
সম্পর্কের গভীরতা আসে পরীক্ষায়,
বাহ্যিকতা নয়, অভিজ্ঞতাই সত্যের আয়না।
৫০. 💎 রূপ নয়, গুণ চাই
বাগদাদের বাদশা হারুনুর রশীদের অনেক ক্রীতদাসী ছিল। দাস-প্রথা হিসাবে দাসী-বৃত্তির কর্ম-ব্যস্ততার পর তারা স্ত্রীর মত মালিকের শয়ন- শয্যায় স্থান পেত। তাঁর সুন্দর সুন্দর দাসীদের মধ্যে অন্য একটি দাসী ছিল কৃষ্ণকায় কুশ্রী। কিন্তু তিনি সেই কালুনীকেই বেশী ভালবাসতেন।
হাসিতে খুশিতে, হর্ষে-বিষাদে সেই কালুনীই তাঁর পাশে পাশে থাকত। তা দেখে সুন্দরীদের হিংসা হল। বাদশার কাছে সে অস্বাভাবিক ভালবাসার কারণ জানার ইচ্ছা করল তারা। একদা অভিমান-ভরা হৃদয় নিয়ে রূপের ঝলক ও সুমধুর হাসির বেদনা ভরা ভাষা দিয়ে সে কথার ভূমিকা শুরু করল।
বলল, হুজুর! আমরা এত স্বাস্থ্যবতী রূপসী থাকা সত্ত্বেও আপনি ঐ কুৎসিত কালুনীকে কেন বেশী ভালবাসেন?
নিঃসন্দেহে বাদশার চোখের কোন দোষ ছিল না। তা জেনেই তারা প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের আশায় এই আর্জি পেশ করল।
বাদশা বললেন, সে কথা জানার যদি তোমাদের একান্তই আগ্রহ থাকে, তাহলে আজ নয়, পরে জানাব।
দাসীরা সে প্রস্তাব মেনে নিয়ে অধীর অপেক্ষায় কালাতিপাত করতে লাগল।
হঠাৎ একদিন কোন উপলক্ষ্যে সকল বিবিকে উপহার দেওয়ার জন্যে একটি বৃহৎ কক্ষ সুসজ্জিত করালেন। কক্ষের শেষের দিকে এক-একটি বাক্সতে অনেক গয়না ও উপহার-সামগ্রী রাখলেন।
অতঃপর স্ত্রীদের সকলকে ডেকে বললেন, কক্ষের শেষ প্রান্তে তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি করে বাক্স রাখা আছে, তাতে নানা রকম উপহার ও গয়না আছে। তোমাদের মধ্যে দৌড়িয়ে গিয়ে যে যেটা হাত দিয়ে স্পর্শ করবে, সেটা তারই হবে।
যথাসময়ে প্রতিযোগিতার দৌড় শুরু হল। রাজার আদেশ মত দৌড় দিয়ে প্রত্যেকে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে বলল, এটা আমার, এটা আমার। কিন্তু কালুনী দৌড়িয়ে বাক্সতে হাত না দিয়ে রাজার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে সবাই তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল, এখানে ঠাকুরের মত দাঁড়িয়ে রইলি, অলংকার ও উপহার তো পেলি না।
সে মৃদু হাসি হেসে বলল, তোরা ছুটে গিয়ে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে কিছু অলংকার ও উপহার পেয়েছিস। আর আমি যে বাক্সে হাত দিয়ে আছি, সে বাক্স লাভ করে তোদেরসহ গোটা বাগদাদ লাভ করেছি।
এ জবাব শুনে তারা সবাই অবাক হল। তারা নিজেরাই অনুমান করল যে, এই কারণেই বাদশা ওকে বেশী ভালবাসেন।
বাদশা বললেন, এখন তোমরা তোমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর পেলে, যা ঈর্ষাবশতঃ কয়েকদিন আগে আমাকে করেছিলে।
লজ্জায় সকলের মাথা নিচু হয়ে গেল। তারা কালুনীকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারল না।
কালুনীর রূপ ছিল না, কিন্তু গুণ ছিল। আর তার জন্যই সে বাদশার অতি প্রিয় জান (আদুরিণী) ছিল। আসল সৌন্দর্য রুপে নয়, গুণে। আর জ্ঞানীরা তা জ্ঞানচক্ষুতে অবলোকন করে থাকেন।
গুণবান হইলে মান সব ঠাঁই, গুণহীনের সমাদর কোনখানে নাই।
📖 সারাংশ: বাগদাদের বাদশা হারুনুর রশীদ তাঁর সুন্দর দাসীদের মধ্যে এক কালো, কুশ্রী দাসীকেই বেশি ভালোবাসতেন। অন্যরা ঈর্ষা করে কারণ জানতে চায়। বাদশা একদিন প্রতিযোগিতা রাখেন—যে যা স্পর্শ করবে, তা তার হবে। সবাই বাক্সে হাত দেয়, কিন্তু কালুনী বাদশার কাঁধে হাত রাখে। সে বলে, “আমি যে বাক্সে হাত দিয়েছি, তা পেয়ে গোটা বাগদাদ পেয়েছি।” তখন সবাই বুঝে যায়—রূপ নয়, গুণই আসল।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গুণ ও চরিত্র চিরস্থায়ী। সত্যিকারের ভালোবাসা আসে হৃদয়ের গুণ থেকে, রূপ থেকে নয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- বাদশা কেন কালুনীকে বেশি ভালোবাসতেন?
- কালুনী বাক্সে হাত না দিয়ে কী করেছিল?
- এই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি সৌন্দর্য ও গুণ সম্পর্কে?
গুণবান হইলে মান সব ঠাঁই,
গুণহীনের সমাদর কোনখানে নাই।
🤲 দোয়া
হে আল্লাহ! আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে ঈমান, নৈতিকতা, এবং আপনার প্রতি ভালোবাসা গেঁথে দিন। তাদেরকে হিংসা, অহংকার, অলসতা ও দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করুন। প্রতিটি গল্প যেন তাদের জীবনে আলো হয়ে জ্বলে ওঠে—এই দোয়া করি আপনার দরবারে।
📖 শিশুদের ইসলামিক গল্পের সম্পূর্ণ সিরিজ
শিশুদের জন্য সাজানো ইসলামিক গল্পের সব পর্ব একসাথে পড়তে চাইলে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, আশা করি শিশুদের জন্য ইসলামিক নৈতিক শিক্ষা গল্প গুলো পড়ে আপনার ভালো লেগেছে এবং আপনার ছোট্ট বাবুরাও শুনে আনন্দিত হয়েছে। ইসলামের আলো সবার হৃদয়ে পৌঁছে দিতে এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না। এবং আমার বাংলা পোস্ট.কম কে অবশ্যই মনে রাখুন।