
📚 গল্পের সূচিপত্র (২১–৩০)
- ২১. 🍽️ মেহমানের খাতির!
- ২২. 🍎 এক পরহেযগার যুবক!
- ২৩. 🙇♂️ বিনয়ের নমুনা
- ২৪. 🏛️ রাষ্ট্রনেতা হলে এমন!
- ২৫. 🪙 হারানো মুদ্রা-কলস
- ২৬. 😈 শয়তানের কাজ
- ২৭. 🗣️ লোকের সমালোচনা
- ২৮. 🐱 কুয়াতে বিড়াল মরা
- ২৯. 🏠 বাড়ির প্রভাব স্কুলে
- ৩০. 🌟 হিংসিতের বিজয়
২১. মেহমানের খাতির!
মসজিদে নববীতে একটি ছাউনিবিশিষ্ট ঘর ছিল। সেখানে আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর তত্ত্বাবধানে কিছু সাহাবা আশ্রয় গ্রহণ করতেন ও বসবাস করতেন। তাঁদেরকে ‘আসহাবে সুফ্ফাহ‘ বলা হতো। তাঁরা নিতান্ত গরীব মানুষ ছিলেন। একদা রসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “যার কাছে দু’জনের আহার আছে সে যেন (তাদের মধ্য থেকে) তৃতীয় জনকে সাথে নিয়ে যায়। আর যার নিকট চারজনের আহারের ব্যবস্থা আছে, সে যেন পঞ্চম অথবা ষষ্ঠজনকে সাথে নিয়ে যায়।
আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং রসূলুল্লাহ (সাঃ) দশজনকে সাথে নিয়ে গেলেন। আবু বকর (রাঃ) নিজ পুত্র আব্দুর রহমানকে বললেন, ‘তোমার মেহমান নাও। (তুমি তাদের খাতির কর) আমি নবী এর নিকট যাচ্ছি। আমার ফিরে আসার আগে আগেই তুমি (খাইয়ে) তাঁদের খাতির সম্পন্ন করো।’
আবু বকর (রাঃ) ফিরে এসে রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ঘরেই রাতের আহার করলেন এবং এশার নামায পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। এশার নামাযের পর তিনি পুনরায় রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ঘরে ফিরে এলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছামত রাতের কিছু সময় সেখানে অতিবাহিত করলেন।
এদিকে আব্দুর রহমান বাড়িতে যে খাবার ছিল, তা নিয়ে তাঁদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আপনারা খান।’ কিন্তু মেহমানরা বললেন, ‘আমাদের বাড়ি ওয়ালা কোথায়?” তিনি বললেন, ‘আপনারা খান।’
তাঁরা বললেন, ‘আমাদের বাড়ি ওয়ালা না আসা পর্যন্ত আমরা খাব না।’ আব্দুর রহমান বললেন, ‘আপনারা আমাদের তরফ থেকে মেহমান- নেওয়াযী গ্রহণ করুণ। কারণ তিনি এসে যদি দেখেন যে, আপনারা খাননি, তাহলে অবশ্যই আমরা তাঁর নিকট থেকে (বড় ভর্ৎসনা) পাব।’
কিন্তু তাঁরা কোনমতেই (খেতে) সম্মত হলেন না । (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি বুঝে নিলাম যে, আব্বা আমার উপর খাপ্পা হবেন।
ক্ষণকাল পর আবু বকর (রাঃ) বাড়ি ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, ‘বাইরে কিসে আপনাকে আটকে রেখেছিল?’
: তিনি বললেন, ‘তুমি এখনো মেহমানদেরকে খাবার দাওনি?’
: স্ত্রী বললেন, ‘আপনি না আসা পর্যন্ত তাঁরা খেতে রাজি হলেন না। তাঁদের সামনে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা তা খাননি।’ আব্দুর রহমান ভয়ে বাড়ির কোন অংশে লুকিয়ে গেলেন।
: তিনি বললেন, “আরে কী করেছ তোমরা?’ অতঃপর তিনি ডাক দিলেন, ‘আব্দুর রহমান!
: আব্দুর রহমান নিরুত্তর থাকলেন।
: তিনি আবার ডাক দিলেন, ‘আব্দুর রহমান?’ কিন্তু তখনও তিনি নীরব থাকলেন। তারপর আবার বললেন, ‘এ বেওকুফ! আমি তোমাকে কসম দিচ্ছি, যদি তুমি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছ, তাহলে এসে যাও।’ অতঃপর ‘নাককাটা’ ইত্যাদি বলে গালাগালি করলেন।
: (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি (বাধ্য হয়ে) বের হয়ে এলাম। বললাম, ‘আপনি আপনার মেহমানদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, (আমি তাঁদেরকে খেতে দিয়েছিলাম কি না?)’
: তাঁরা বললেন, ‘ও সত্যই বলেছে। ও আমাদের কাছে খাবার নিয়ে এসেছিল। (আমরাই আপনার অপেক্ষায় খাইনি।)
: আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা আমার অপেক্ষা করে বসে আছ। কিন্তু আল্লাহর কসম! আজ রাতে আমি আহার করব না।’ তা দেখে তাঁর স্ত্রীও খাবেন না’ বলে কসম করলেন।
: মেহমানরা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আপনি না খাওয়া পর্যন্ত আমরাও খাব না।’
: তিনি বললেন, ‘ধিক্কার তোমাদের প্রতি! তোমাদের কী হয়েছে যে, আমাদের পক্ষ থেকে মেহমান-নেওয়াযী গ্রহণ করবে না?” (অতঃপর ছেলের উদ্দেশ্য বললেন,) নিয়ে এস তোমার খাবার।
: সুতরাং তিনি খাবার নিয়ে এলে আবু বকর (রাঃ) তাতে হাত রেখে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ। রাগের অবস্থায় কসম ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে। অতঃপর তিনি খেতে লাগলেন এবং মেহমানরাও আহার করতে শুরু করলেন।
আব্দুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমরা লোকমা (খাদ্যগ্রাস) উঠিয়ে নিতেই নীচ থেকে তা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছিল। সকলেই পেট ভরে খেলেন। অথচ পূর্বের চেয়ে বেশি খাবার রয়ে গেল।’ পরিশেষে, অতিরিক্ত খাবার নবী (সাঃ) এর দরবারে পাঠিয়ে দিলেন। তিনিও তা হতে খেলেন।
তিনি বলেন, ‘এদিকে আমাদের এবং অন্য একটি গোত্রের মাঝে যে চুক্তি ছিল তার সময়সীমা পূর্ণ হয়ে যায়। (এবং তারা মদীনায় আসে।) অতঃপর আমরা তাদেরকে তাদের বারো জনের নেতৃত্বে ভাগ করে দিই। প্রত্যেকের সাথেই কিছু কিছু লোক ছিল। তবে প্রত্যেকের সাথে কতজন ছিল তা আল্লাহই বেশি জানেন। তারা সকলেই সেই খাদ্য আহার করল।’
🍽️ মেহমানের খাতির!
📖 সারাংশ: আসহাবে সুফ্ফাহ ছিলেন গরীব সাহাবী, যাদের জন্য নবী (সা.) সাহাবীদের আহার ভাগ করে নিতে বললেন। আবু বকর (রা.) তিনজনকে নিয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে মেহমানরা খেতে রাজি হলেন না। পরে রাগ, ভুল বোঝাবুঝি ও বরকতের মধ্য দিয়ে এক হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা ঘটে।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: আতিথেয়তা শুধু খাবার নয়, বরং ইখলাস, ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মান। আল্লাহর নামে দেওয়া খাবারে বরকত হয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- আবু বকর (রা.) কেন রাগ করেছিলেন, এবং পরে কী বলেছিলেন?
- খাবারে কীভাবে বরকত দেখা গিয়েছিল?
২২. এক পরহেযগার যুবক!
পথ চলতে একটি যুবক বড় ক্ষুধার্ত ছিল। নদীতে নেমে অযূ করতে গিয়ে দেখতে পেল, একটি আপেল পানিতে ভেসে আসছে। সেটিকে তুলে সে খেয়ে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণে তার বিবেক তাকে কামড় দিতে লাগল । ভাবল, এ আপেল তো কোন বাগান মালিকের। তার অনুমতি ছাড়া কেন সে খেয়ে ফেলল। কোন মুসলিমের মাল তার অনুমতি ছাড়া ভক্ষণ করা তো বৈধ নয়। সুতরাং সে নদীর উজান পথে চলতে শুরু করল। নিশ্চয় নদীর ধারে অবস্থিত কোন বাগান থেকে ঐ আপেলটি ভেসে এসেছে।
চলতে চলতে একটি বাগান দৃষ্ট হল। সেখানে প্রবেশ করে মালিকের কাছে ওযর পেশ করে বলল, ‘জী! আমি আপনার বিনা অনুমতিতে আপনার বাগানের একটি আপেল খেয়ে ফেলেছি। তার জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী!’
বাগানের মালিকও পরহেযগার মানুষ। কিন্তু যুবকের এ পরহেযগারি দেখে সে বড় অবাক হল। প্রকৃতিগতভাবে সে যুবককে ভালবেসে ফেলল। কিছু সময় নীরব থেকে মালিক বলল, ‘তুমি আমার বিনা অনুমতিতে আমার বাগানের আপেল খেয়েছ, আর আমি তোমাকে ক্ষমা করব? কক্ষনো না। আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব!’
যুবক আরো ভয় পেয়ে গেল। সে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। কিন্তু মালিক ক্ষমা না করে নিজ বাসায় প্রবেশ করল। অতঃপর নামাযের জন্য বের হয়ে দেখল, সে তখনও বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে!
দেখা হতেই যুবক বলল, ‘চাচাজী! আপনি আমার কাছে আপেলের দাম নিতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে তো কোন দীনার দিরহাম নেই। তার পরিবর্তে আমি আপনার বাগানে কাজ করে দিতে পারি।
: মালিক তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘আমি শর্তসাপেক্ষে তোমাকে ক্ষমা করতে পারি।’
: বলুন কী শর্ত। ক্ষমা পাওয়ার জন্য আমি আপনার যে কোন শর্ত মেনে নিতে রাজি আছি।
: আমার একটা মেয়ে আছে, যে চোখে দেখে না, কানে শোনে না, মুখে বলে না এবং পায়ে হাঁটে না। তাকে তোমাকে বিয়ে করতে হবে।
: যুবক মনে মনে ভাবল, এমন মেয়ে বিয়ে করে তার লাভ কী? যাকে বিছানায় বসে খাওয়াতে হবে। তবুও শর্ত মানতে রাজি যখন হয়েছে, তখন তা করতেই হবে। সে বলল, ‘আমি রাজি আছি।’
: বিয়ের দিন হয়ে গেল। যুবক উপস্থিত হল, কিন্তু তার মনে কোন খুশির ঝিলিক ছিল না। বিয়ে হয়েও গেল। বাসর রাতে কক্ষে প্রবেশ করতেই সে ঝিলিক তার মনের আকাশকে উজ্জ্বল করে তুলল। তার স্ত্রী দরজার কাছে উঠে এসে তাকে সালাম দিল। কোন ত্রুটি নেই তার দেহাঙ্গে।
: সে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কোন ত্রুটি নেই। তাহলে তোমার আব্বা আমাকে মিথ্যা বললেন কেন?”
স্ত্রী বলল, ‘আপনাকে অবাক করার জন্য। আর উনি মিথ্যা তো বলেননি। বাস্তবেই আমি কোন হারাম জিনিস চোখে দেখি না, কোন হারাম জিনিস কানে শুনি না, কোন হারাম কথা মুখে বলি না এবং কোন হারাম পথে পায়ে হাঁটি না। আমার আব্বা আমার উপযুক্ত বর খুঁজছিলেন। অতঃপর আপনি যখন একটি আপেল খেয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এলেন, তখন তিনি ভাবলেন, যে যুবক অনুমতি ছাড়া পরের একটা আপেল খেয়ে আল্লাহকে এত ভয় করতে পারে, সে যুবক নিশ্চয় আমার মেয়ের ব্যাপারে অধিক ভয় করবে। তাই তিনি প্রস্তাব দিয়ে এই বিয়ে ঠিক করেছিলেন।’
বড় ভাগ্যবান সে যুবক, বড় ভাগ্যবতী সে যুবতী। কিছু দিন পর তাদের একটি সন্তান হল। তোমরা জানো কি, সে সন্তানের নাম কী। নু’মান, আবূ হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
🍎 এক পরহেযগার যুবক!
📖 সারাংশ: এক যুবক নদীতে ভেসে আসা একটি আপেল খেয়ে ফেলেন, পরে আল্লাহভীতির কারণে মালিকের কাছে ক্ষমা চাইতে যান। মালিক তাঁকে কঠিন শর্তে ক্ষমা করেন—নিজ মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। পরে জানা যায়, সেই মেয়ে ছিল চরিত্রে পরিপূর্ণ। তাঁদের সন্তান হন ইমাম আবু হানিফা (রাহ.)।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: আল্লাহভীতি ও পরহেযগারিতা এমন গুণ, যা গোপন অবস্থায়ও চরিত্র রক্ষা করে। যারা ছোট ভুলেও ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাদের বড় সম্মান দেন।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- যুবক কী কারণে আপেল খাওয়ার পর ভয় পেয়েছিলেন?
- মেয়েটি কীভাবে “ত্রুটিহীন” ছিল, এবং তার ব্যাখ্যা কী?
২৩. বিনয়ের নমুনা
একদা রাত্রে উমার বিন আব্দুল আযীয (রা:) এর নিকট এক মেহমান ছিল। তিনি কিছু লিখছিলেন। এমন সময় তেলের বাতি নিভুনিভু হল।
: মেহমানটি বলল, বাতিটা ঠিক করে দিই।
: তিনি বললেন, মেহমানকে কাজে লাগানো বা মেহমানের নিকট থেকে খিদমত নেওয়া আতিথেয়তা-বিরোধী।
: মেহমান বলল, তাহলে চাকরকে জাগিয়ে দিই।
: তিনি বললেন, ও এই মাত্র প্রথম ঘুমিয়েছে, ওকে জাগাও না। অতঃপর তিনি নিজে উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে তা ঠিক করে আনলেন।
: মেহমানটি বলল, আপনি নিজে কষ্ট করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন!
: তিনি উত্তরে বললেন, (তেল ভরতে ভরতে) তখন আমি যে উমার ছিলাম, এখনও সেই উমারই আছি। আমার মধ্যে কিছুই কমে যায়নি। পরন্ত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহর কাছে বিনয়ী।
🙇♂️ বিনয়ের নমুনা
📖 সারাংশ: এক রাতে উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহ.)–এর ঘরে বাতি নিভে গেলে মেহমান ও চাকরকে বিরক্ত না করে তিনি নিজেই উঠে গিয়ে বাতি ঠিক করেন। মেহমান অবাক হলে তিনি বলেন, “আমি তখন যে উমার ছিলাম, এখনও সেই উমারই আছি।”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: সত্যিকারের নেতা নিজেকে বড় মনে করেন না। বিনয় ও দায়িত্ববোধ একজনকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- উমার (রাহ.) কেন নিজে বাতি ঠিক করতে গেলেন?
- তিনি কী বলে বুঝিয়েছিলেন যে, নেতৃত্ব বিনয়ের সঙ্গে থাকতে হয়?
২৪. রাষ্ট্রনেতা হলে এমন!
একদা উমার বিন আব্দুল আযীয় কে দেখা গেল, তিনি রোদে বসে আছেন। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কি অসুস্থ?
: তিনি বললেন, না আমি আমার (পরিহিত) কাপড় শুকাচ্ছি!
: প্রশ্নকারী অবাক হয়ে বলল, আপনার পোশাক কী, হে আমীরুল মুমিনীন ! তিনি বললেন, লুঙ্গি, কামীস ও চাদর।
: প্রশ্নকারী বলল, আর একটি করে লুঙ্গি, কামীস ও চাদর গ্রহণ করেন না কেন?
: তিনি বললেন, ছিল, পুরাতন হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
: প্রশ্নকারী বলল, অন্যের তো গ্রহণ করতে পারেন?
: এ কথা শুনে তিনি মাথা নিচু করে কেঁদে ফেললেন এবং কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন:
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
অর্থ: এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। (সুরা কাসাস : আয়াত ৮৩)
🏛️ রাষ্ট্রনেতা হলে এমন!
📖 সারাংশ: উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহ.)–কে রোদে বসে কাপড় শুকাতে দেখা যায়। প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তাঁর পুরাতন পোশাক নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন নিতে চান না, কারণ দুনিয়ার বিলাসিতা নয়—আখিরাতের শান্তিই তাঁর লক্ষ্য। তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করে কেঁদে ফেলেন।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: একজন আদর্শ নেতা দুনিয়ার সম্মান নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়। বিনয়, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতা নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- উমার (রাহ.) কেন নতুন পোশাক নিতে চাননি?
- তিনি কোন কুরআনের আয়াত পাঠ করেছিলেন, এবং কেন?
২৫. হারানো মুদ্রা-কলস
এক ব্যক্তি লম্বা সফরে বিদেশে গিয়েছিল। তখনকার যুগে কোন ব্যাংক ছিল না। সুতরাং জমানো স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা কলসে ভরে মাটিতে পুঁতে গোপন রাখতে হতো। সে তাই করেছিল। তার বাড়ির বাগানের একটি জায়গায় মুদ্রার কলসটি পুঁতে রেখেছিল।
কিন্তু বহুদিন পর ফিরে এসে সেই জায়গাটি আর মনে পড়ছিল না। তার উপার্জিত ধন হারিয়ে যাবে, তা কীভাবে হয়? তার চলবে কীভাবে?
সুতরাং সে এক সময় ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) এর নিকট কোন ব্যবস্থা নিতে উপস্থিত হল। যদিও এটি কোন দ্বীনী মাসআলা ছিল না, তবুও জ্ঞানী ভক্তি ভাজনের কাছে দুনিয়াবী সমস্যার কথাও জানানো হয়।
সে বলল, জনাব! আমি আমার মুদ্রার কলসটি কোথায় পুঁতে রেখেছি, তা মনে পড়ছে না। এখন আমি কী করতে পারি?
: বিচক্ষণ ইমাম চট করে বললেন, তুমি আজ সারা রাত নামায পড়ো।
: লোকটি অবাক হয়ে বলল, জনাব! মুদ্রার কলসের সাথে নামাযের কী সম্পর্ক?
: তিনি বললেন, আমি যা বললাম, তাই করো। তারপর সকালে এসে ফলাফল বলো।
লোকটি নিরাশ মনেও আশাবাদী হয়ে ফিরে গেল। ইশার নামাযের পর শুরু করল নফল নামায পড়তে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এক রাক’আত শেষ হতে না হতেই তার সেই জায়গাটির কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে সে কলসটি পুঁতে রেখেছিল। সুতরাং দুই রাক’আত কোন রকমে শেষ করে কোদাল নিয়ে ছুটল সেই জায়গার দিকে। কিছু খুঁড়তেই বের হয়ে এল মুদ্রার সেই কলস! সে যে কী খুশি! তাকে আর নামায পড়তে হল না।
লোকটা বড় অবাক হল, নামাযের এত বড় ক্ষমতা? ফজরের নামায পড়েই সে ইমাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করে বলল, দারুন প্রেসক্রিপশন হুযুর! এক রাক’আত শেষ না হতেই মনে পড়ে গেল!
ইমাম সাহেব বললেন, আমি জানতাম, শয়তান তোমাকে সারা রাত নামায পড়তে দেবে না। তার মানে শয়তান জরুরী জিনিস ভুলিয়ে দেয়, যাতে মানুষের ক্ষতি হয়, আবার জরুরী জিনিস মনেও পড়িয়ে দেয়, যদি তার মাধ্যমে মানুষের অধিকতর বড় ক্ষতি হয়। সে অনেক সময় মানুষের উপকার করে, কিন্তু তা কেবল তার ক্ষতি করার জন্য। এই জন্য নামাযের মধ্যে অনেক বিস্মৃত কথা সে মনে পড়িয়ে দেয়।
🪙 হারানো মুদ্রা-কলস
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি তার বাগানে পুঁতে রাখা মুদ্রার কলসের জায়গা ভুলে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) তাকে সারা রাত নামায পড়তে বলেন। এক রাক’আতের মধ্যেই তার মনে পড়ে যায় জায়গাটি। পরে ইমাম ব্যাখ্যা করেন, শয়তান নামাযে মনোযোগ নষ্ট করতে গিয়ে অনেক সময় ভুলে যাওয়া জিনিসও মনে করিয়ে দেয়।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: নামায শুধু ইবাদত নয়, বরং মন ও স্মৃতির শক্তি বাড়ায়। শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পথে থাকলে উপকারই হয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) কী পরামর্শ দিয়েছিলেন?
- শয়তান কীভাবে নামাযে ভুলে যাওয়া কথা মনে করিয়ে দেয়?
২৬. শয়তানের কাজ
: এক ছাত্র তার উস্তাযকে জিজ্ঞাসা করল, হযরত! শয়তানের কাজ কেমন?
: উস্তায বললেন, শয়তানের কাজ ছোট্ট কিছু লাগিয়ে দেওয়া।
: জী! বুঝলাম না।
: সে সামান্য কিছু দিয়ে লাগিয়ে দেয়। অতঃপর তার থেকে শুরু হয় বিরাট হাঙ্গামা। যেমন ছোট্ট একটি আগুনের টুকরা একটি গ্রাম বা শহর বা বিরাট জঙ্গলকে ছারখার করতে পারে, তেমনি শয়তানের সামান্য চক্রান্ত ও বিরাট ধ্বংস-লীলা আনতে পারে। চল মিষ্টির দোকানে গিয়ে তোমাকে শয়তানের লীলা দেখাই।
উস্তায ছাত্র মিলে একটি মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খেতে লাগল। খেতে খেতে উস্তায মিষ্টির একটু রস লাগিয়ে দিলেন দেওয়ালে। ক্ষণেক পর ঐ রসে কিছু মাছি এসে বসল। তা দেখে টিকটিকি এল মাছি ধরতে। ইত্যবসরে এক ক্রেতার পোষা কুকুর সেই টিকটিকিকে ধরতে লাফ মারল । কিন্তু ঘুরে পড়ে গেল মিষ্টির গামলায়। তা দেখে ময়রা চিৎকার করে কুকুরটিকে মারতে শুরু করল। তা দেখে কুকুর-ওয়ালা বাধা দিলে বাগ- বিতণ্ডা হতে হতে হাতাহাতি, লাঠালাঠি ও শেষে থানা-পুলিশ হয়ে গেল।
বলা বাহুল্য, দেওয়ালে মিষ্টির রস লাগানোর মত ছোট্ট কাজ ঐ শয়তানের। কিন্তু জ্ঞানীরা যদি ধৈর্যের সাথে শুরুতেই শয়তানের চক্রান্ত কে প্রতিহত করে, তাহলে এত বাড়াবাড়ি আর হয় না।
😈 শয়তানের কাজ
📖 সারাংশ: এক ছাত্র উস্তাযকে জিজ্ঞাসা করে শয়তানের কাজ কেমন। উস্তায একটি মিষ্টির দোকানে ছোট্ট রস লাগিয়ে বিশাল ঝগড়ার উদাহরণ দেখান—যা মাছি, টিকটিকি, কুকুর, ময়রা, ক্রেতা, এবং শেষে থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: শয়তান ছোট্ট একটি ভুল দিয়ে বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। শুরুতেই ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিহত করতে না পারলে ক্ষতি অনেক বড় হয়।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- উস্তায কীভাবে শয়তানের কাজের উদাহরণ দিলেন?
- ছোট্ট রস লাগানোর ফলে কী কী ঘটনা ঘটেছিল?
২৭. লোকের সমালোচনা
একদা লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র সহ একটি গাধার পিঠে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কতক লোক বলতে লাগল, লোকটা কত নিষ্ঠুর! একটি গাধার পিঠে দু’দুটো লোক!
এ কথা শুনে হাকীম নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু দূর পরে আরো কিছু লোক তাঁদেরকে দেখে বলে উঠল, ছেলেটি কত বড় বেআদব! বুড়োটাকে হাঁটিয়ে নিজে সওয়ার হয়ে যাচ্ছে!
এ কথা শুনে ছেলেটি নেমে এল এবং হাকীম সওয়ার হলেন। আরো কিছু দূর পর কিছু লোক বলতে লাগল, বুড়োটির কী আক্কেল! নিজে গাধার পিঠে চড়ে বাচ্চাটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!
এ কথা শুনে তিনিও গাধার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু পরে আরো কিছু লোক সমালোচনার সুরে বলল, লোক দুটো কী বোকা! সঙ্গে সওয়ার থাকতে পায়ে হেঁটে পথ চলছে!
এ বারে হাকীম তাঁর ছেলেকে বললেন, দেখলে বাবা! তুমি চাপলেও দোষ, আমি চাপলেও দোষ, দুজনে চড়লেও দোষ, কেউ না চড়লেও দোষ। সুতরাং দুনিয়ার কাজে তুমি কারো সমালোচনায় কর্ণপাত করো না। কারণ, লোকের খোঁটা থেকে বাঁচা কঠিন। নিজের বিবেকে কাজ করে যাওয়া উচিত। হাথী চলতা রহেগা, কুত্তা ভুক্তা রহেগা।
🗣️ লোকের সমালোচনা
📖 সারাংশ: লোকমান হাকীম (আ.) ও তাঁর ছেলে গাধায় চড়ে, নেমে, পালা করে চড়ে—সব অবস্থাতেই লোকেরা সমালোচনা করে। শেষে তিনি বলেন, “তুমি যাই করো, মানুষ কিছু না কিছু বলবেই। তাই নিজের বিবেকের নির্দেশ মেনে চলাই শ্রেষ্ঠ।”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: মানুষ কী বলবে তা নিয়ে চিন্তা না করে, সৎভাবে নিজের কাজ করে যেতে হয়। সমালোচনার ভয় নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই আসল লক্ষ্য।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- লোকমান হাকীম (আ.) ও তাঁর ছেলে কী কী অবস্থায় সমালোচিত হয়েছিলেন?
- তিনি শেষ পর্যন্ত কী শিক্ষা দিলেন তাঁর ছেলেকে?
২৮. কুয়াতে বিড়াল মরা
এক ব্যক্তির বাড়ির কুয়াতে বিড়াল পড়ে মারা গেছে। তা কেউ খেয়াল করেনি। দু-তিন দিনের ভিতরে পানিতে গন্ধ সৃষ্টি হল। লোকটি ফতোয়া নিতে ছুটল ইমাম সাহেবের কাছে। বলল, হুযুর!
আমার বাড়ির কুয়াতে বিড়াল পড়ে মারা গেছে, পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এখন তাতে উযূ-গোসল হবে কি?
হুযুর বললেন, না। ও পানি নাপাক হয়ে গেছে।
: তাহলে উপায়?
: উপায়, চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলতে হবে।
: তাহলে কুয়ার পানি পাক হয়ে যাবে?
: তাই তো হওয়ার কথা।
লোকটি বাড়ি ফিরে চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলল। কিন্তু পানির দুর্গন্ধ দূর হল না। হুযুর কি ফতোয়া ভুল দিলেন নাকি? পরদিন সে আবার হুযুরের কাছে গেল এবং অবস্থা খুলে বলল। হুযুর বললেন, আবার চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলতে হবে, তাহলে পাক হয়ে যাবে।
লোকটি বাড়ি ফিরে তাই করল। কিন্তু কোন লাভ হল না। সেই একই দুর্গন্ধ; বরং তার থেকেও বেশি। পরদিন আবার গেল হুযুরের কাছে। বলল, কেমন ফতোয়া হুযুর? পানির দুর্গন্ধ বেড়ে যায় বৈ কমে না! হুযুর বললেন, আপনার বালতি ছোট না বড়?
: বড় বালতি।
: গুনতে ভুল হয় না তো?
: মোটেই না। আমি তুলি, আমার স্ত্রী গণে।
: ঠিক আছে, আরও চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলে দিন। এবার আশা করি পানি পাক হয়ে যাবে।
লোকটি তাই করল। কিন্তু কোন ফায়দা দেখল না। হুজুরের কাছে এসে বিরক্তির-সুরে বলল, কোন লাভ নেই হুযুর! আপনার ফতোয়ায় মনে হয় গলদ আছে!
হুযুর হেসে গেলেন এবং লোকটির কুয়ো দেখতে চাইলেন। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সাদা মতো পানির উপরে কী যেন ভাসছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সাদা মতো ওটা কী?
: কী জানি, মনে হয় বিড়ালটা হবে।
: আরে সে কী? আপনি বিড়াল আগে তুলে না ফেলেই বালতি-বালতি পানি তুলে ফেলে যাচ্ছেন?
: বিড়াল তুলে ফেলতে তো বলেননি হুযুর!
: বড় বোকা আপনি! সেটাও কি বলতে হতো?
: ভেঙ্গে না বললে আমরা মূর্খ মানুষ বুঝব কীভাবে?
বলা বাহুল্য, ডাক্তার, মুফতী ও বিচারকের উচিত, অবস্থা ভালোভাবে বুঝে, ভেঙ্গে বলে ব্যবস্থা দেওয়া। অন্যথা ব্যবস্থা নিষ্ফল হয় অথবা হিতে বিপরীত হয়।
দ্বিতীয়ত: যে পাপী তওবা করে, তার উচিত, পাপ বর্জন করা। অবৈধ উপায়ে নেওয়া জিনিস তার মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। অন্যথায় তওবা কবুল হবে না। অন্তরে কপটতা গোপন রেখে কোন ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। হৃদয়ে ঘৃণা লুকিয়ে রেখে হাতে হাত মিলানো উপকারী নয়।
🐱 কুয়াতে বিড়াল মরা
📖 সারাংশ: এক ব্যক্তি কুয়োর পানিতে দুর্গন্ধ পেয়ে ইমাম সাহেবের কাছে যান। বারবার পানি তুলেও দুর্গন্ধ দূর হয় না, কারণ বিড়ালটি কুয়োতেই রয়ে গেছে! শেষে ইমাম বলেন, “বিড়াল তো আগে তুলতে হবে!”
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: সমস্যার মূল কারণ দূর না করলে সমাধান হয় না। যেমন তওবা করতে হলে শুধু কান্না নয়—পাপ বর্জন ও ক্ষতিপূরণ জরুরি।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- লোকটি কী ভুল করেছিল, যার ফলে পানি পাক হয়নি?
- ইমাম সাহেব কী শিক্ষা দিলেন সমস্যার সমাধান নিয়ে?
২৯. বাড়ির প্রভাব স্কুলে
অঙ্কের মাষ্টার তাঁর এক বোকা ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, ৪ ভাগ ২ সমান কত? প্রথমে সে বলল, শুনতে পাইনি স্যার।
তারপর ছাত্র বলল, বুঝতে পারলাম না স্যার, বুঝিয়ে দিন।
মাষ্টার বললেন, যদি তোমার বাবার কাছে ৪ টাকা থাকে এবং তা তোমার ও তোমার ভাই-এর মাঝে ভাগ করে দেয়, তাহলে তুমি ও তোমার ভাই কত করে ভাগ পাবে ?
চট করে সে বলল, আমি ১ টাকা, আর আমার ভাই ৩ টাকা পাবে স্যার।
মাষ্টার টেবিল ঠুকে বললেন, ভুল, ভুল। কিন্তু ছাত্রটি বলল, না স্যার, ঠিকই। আমার বাবা আমার ভাইকেই সর্বদা বেশী দেয়।
🏠 বাড়ির প্রভাব স্কুলে
📖 সারাংশ: অঙ্কের শিক্ষক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন, ৪ ভাগ ২ কত? ছাত্র উত্তর দেয়— “আমি ১ টাকা, ভাই ৩ টাকা পাব।” কারণ, তার বাবা সবসময় ভাইকে বেশি দেন।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। পরিবারের আচরণ তাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তাই ঘরে ন্যায় ও ভালোবাসা থাকা জরুরি।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- ছাত্রটি কেন অঙ্কের ভুল উত্তর দিয়েছিল?
- এই গল্পে পরিবারের আচরণ কীভাবে শিক্ষার উপর প্রভাব ফেলেছে?
৩০. হিংসিতের বিজয়
ইউসুফ (আঃ) এর এগারোটি ভাই ছিল। ছোটবেলায় একরাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, এগারোটি তারা ও চাঁদ-সূর্য নেমে এসে তাঁকে সিজদাহ করছে। এ আশ্চর্য স্বপ্ন তিনি আার কাছে প্রকাশ করলেন।
তাঁর আব্বা ছিলেন একজন নবী। তাঁর নাম ছিল ইয়াকুব। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ইউসুফকে জানালেন যে, বড় হলে তুমি রাজা হবে। আর এ কথাও বলে দিলেন যে, এ স্বপ্ন যেন সে তার ভাইদের কাউকে না জানায়। কারণ, তারা জানতে পারলে হিংসা ও চক্রান্ত করবে।
কিন্তু কোন প্রকারে তাঁর ভাইয়েরা সে কথা শুনেই ফেলে এবং তাতে তাদের হৃদয়-মন জ্বলে ওঠে। তারপর তারা এগারো ভাই মিলে কিভাবে তাঁকে হত্যা করতে পারে সেই কৌশল অনুসন্ধান করে।
একদা তারা আব্বাকে বলল, আমরা কাল বাগানে খেলতে যাব। আমরা ছোট ভাই ইউসুফকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। সেও আমাদের সাথে খেলা করবে। আব্বা বললেন, আমার ভয় হয় যে, তোমরা খেলায় মত্ত হয়ে পড়বে এবং ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলবে।
ভাইয়েরা বলল, তা কি হতে পারে? আমরা এতগুলো ভাই, একটি শক্তিশালী দল থাকতে কি বাঘ আমাদের মাঝখান থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাবে? তারা তাদের আব্বাকে বুঝিয়ে ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে গেল। তারা পরামর্শ করে স্থির করল, তারা তাঁকে হত্যা করবে। কেউ বলল, বরং ওকে কুয়োতে ফেলে দেওয়া হোক।
অবশেষে তারা তাঁর গায়ের জামা খুলে নিয়ে তাঁকে এক কুয়োতে ফেলে দিল। কিন্তু আল্লাহ রাখেন যাকে, মারে কে তাহাকে? আল্লাহ তাঁর হিফাযত করলেন। কুয়োর তলদেশে একটি পাথরে জায়গা পেয়ে বেঁচে থাকলেন ইউসুফ।
এদিকে ভাইয়েরা আব্বাকে বুঝাবার জন্য একটি ছাগলছানা হত্যা করে ইউসুফের জামায় তার রক্ত লাগিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরল। তারা মিথ্যা কান্না করে আব্বাকে বলল, আমরা খেলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে এক বাঘ এসে ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে! এ অবস্থা শুনে ও বুঝে আব্বা চরম দুঃখিত হলেন। তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাইলেন এবং ধৈর্য ধারণ করলেন।
এদিকে একদল মুসাফির সে পথে যাওয়ার সময় ঐ কুয়া থেকে পানি আনতে গিয়ে দেখে তাতে একটি অতি সুন্দর শিশু পড়ে আছে। তাঁরা তাঁকে তুলে নিয়ে এসে মিসরের রাজার কাছে বিক্রয় করে।
রাজবাড়িতে বড় (মানুষ) হন ইউসুফ। রাজার কোন ছেলেমেয়ে ছিল না। সেখানে তিনি নিজের কৃতিত্ব ও জ্ঞান দেখিয়ে বিনা দোষে জেল খাটার পর সেখানকার রাজা হন এবং নবীও হন।
পরবর্তীতে তাঁর আব্বা-আম্মা ও ভাইয়েরা সেখানে চলে আসেন। ধৈর্য ধরেছিলেন ইউসুফ। ধৈর্য ধরেছিলেন তাঁর আব্বা-আম্মা। তাই তার প্রতিফল পেলেন সকলেই। বাস্তব হল ইউসুফের স্বপ্ন।
🌟 হিংসিতের বিজয়
📖 সারাংশ: হযরত ইউসুফ (আঃ) ছোটবেলায় একটি মহান স্বপ্ন দেখেন। তাঁর ভাইয়েরা হিংসা করে তাঁকে কুয়ায় ফেলে দেয়। আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেন, মিসরে রাজপ্রাসাদে পৌঁছে দেন, এবং পরে নবী ও রাজা বানান। তাঁর ধৈর্য ও সততার ফলে স্বপ্ন বাস্তব হয় এবং পরিবার পুনর্মিলিত হয়।
🌟 শিক্ষণীয় বার্তা: যারা ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তাদের সম্মান দেন। হিংসা মানুষকে নিচে নামায়, আর ক্ষমা ও সত্য মানুষকে উপরে তোলে। স্বপ্ন পূরণ হয় যখন আল্লাহর উপর ভরসা থাকে।
❓ প্রশ্নোত্তর:
- ইউসুফ (আঃ)–এর ভাইয়েরা তাঁর সাথে কী করেছিল?
- কীভাবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল?
🤲 দোয়া
হে আল্লাহ! আমাদের সন্তানদের সত্য, ধৈর্য, বিনয় ও তাকওয়ার পথে পরিচালিত করুন। তাঁদের অন্তরে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে দিন এবং তাঁদেরকে হযরত ইউসুফ (আঃ), লোকমান হাকীম (আঃ) ও সাহাবীদের আদর্শে গড়ে তুলুন। আমীন।
📌 আগের পর্বগুলো
📖 শিশুদের ইসলামিক গল্পের সম্পূর্ণ সিরিজ
শিশুদের জন্য সাজানো ইসলামিক গল্পের সব পর্ব একসাথে পড়তে চাইলে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।
খুব সুন্দর ও শিক্ষণীয় গল্প ছিল। শিশুদের জন্য সত্যিই অনেক উপকারী। এমন আরও গল্প চাই ইনশাআল্লাহ