বাংলাদেশের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকা: নাম, বসবাস এলাকা ও পরিচিতি

বাংলাদেশ একটি বহু সংস্কৃতির দেশ। বাঙালিদের পাশাপাশি এখানে বসবাস করে বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও জীবনধারার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, যাদের কেউ কেউ নিজেদের ‘আদিবাসী’ আবার সরকারিভাবে যাদের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী (গেজেট প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০১৯) বাংলাদেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টি, যাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার (২০২২ জনশুমারি অনুযায়ী)।

এই লেখায় থাকছে বাংলাদেশের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ তালিকা, তাদের বসবাস এলাকা এবং প্রধান নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, ধর্ম ও উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

বাংলাদেশের প্রধান নৃগোষ্ঠীসমূহ — বিস্তারিত পরিচিতি

বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী উৎসব, দিনাজপুর
ছবিঃ দিনাজপুরের একটি সাংস্কৃতিক উৎসবের দৃশ্য। চিত্র গ্রাহক: Rodium Soren Dipu, Pexels।
নৃগোষ্ঠী প্রধান বসবাস এলাকা ভাষা প্রধান ধর্ম প্রধান উৎসব
চাকমা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান চাকমা বৌদ্ধ বিজু
মারমা বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি মারমা বৌদ্ধ সাংগ্রাই
ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি ককবরক সনাতন বৈসুক
সাঁওতাল রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর সাঁওতালি সনাতন/প্রকৃতিপূজা সোহরাই, বাহা
গারো ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল মান্দি (আচিক) খ্রিস্টান ওয়ানগালা
ওঁরাও দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী কুরুক্স সনাতন ফাগুয়া
তঞ্চঙ্গ্যা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম তঞ্চঙ্গ্যা বৌদ্ধ বিজু
মণিপুরি সিলেট, মৌলভীবাজার মৈতি সনাতন রাসলীলা, ফাগুয়া
খাসিয়া সিলেট, মৌলভীবাজার খাসি খ্রিস্টান
রাখাইন কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা রাখাইন বৌদ্ধ সান্দ্রে (জলকেলি)
বম রাঙামাটি, বান্দরবান বম খ্রিস্টান
খুমি বান্দরবান কুকি-চিন বৌদ্ধ/খ্রিস্টান
ম্রো বান্দরবান ম্রো বৌদ্ধ/সনাতন ছিয়াছত
মুন্ডা সিলেট, খুলনা মুন্ডারী প্রকৃতিপূজা
হাজং ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ হাজং সনাতন

বাংলাদেশের গেজেটভুক্ত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্পূর্ণ তালিকা

২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী (গেজেট প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০১৯) বাংলাদেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বা আদিবাসী নাম ও বসবাস এলাকা নিচে দেওয়া হলো:

ক্র. নৃগোষ্ঠীর নাম মূল বসবাস এলাকা
ওরাওঁ দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া
কোচ ময়মনসিংহ, রংপুর অঞ্চল
কোল খুলনা (কয়রা, ডুমুরিয়া), সাতক্ষীরা
কন্দ সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
কড়া সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
খারিয়া সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
খারওয়ার সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
খাসিয়া সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ
খিয়াং বান্দরবান
১০ খুমি বান্দরবান
১১ গারো ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল
১২ গঞ্জু সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
১৩ গড়াইত সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
১৪ গুর্খা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে
১৫ চাক বান্দরবান
১৬ চাকমা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার
১৭ ডালু বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল
১৮ তঞ্চঙ্গ্যা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার
১৯ ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটি, কুমিল্লা, সিলেট
২০ তেলী সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
২১ তুরি সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
২২ পাহাড়ি/মালপাহাড়ি সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
২৩ পাংখোয়া বান্দরবান, রাঙামাটি
২৪ পাত্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, গাজীপুর, টাঙ্গাইল
২৫ বাগদি সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
২৬ বানাই বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, গাজীপুর, টাঙ্গাইল
২৭ বড়াইক সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
২৮ বেদিয়া সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
২৯ বম রাঙামাটি, বান্দরবান
৩০ বর্মণ বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, গাজীপুর, টাঙ্গাইল
৩১ ভিল সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
৩২ ভূমিজ সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
৩৩ ভুইমালী সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
৩৪ মণিপুরি সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ
৩৫ মারমা বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি
৩৬ মুখ সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
৩৭ ম্রো বান্দরবান
৩৮ মাহাতো বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, টাঙ্গাইল
৩৯ মালো সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
৪০ মাহালী বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর
৪১ মুসহর সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
৪২ রাখাইন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, বরগুনা
৪৩ রাজোয়াড় সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
৪৪ লোহার সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল
৪৫ লুসাই রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি
৪৬ শবর সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
৪৭ সাঁওতাল রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া
৪৮ হুদি নেত্রকোনা (বিরিশিরি, বারহাট্টা)
৪৯ হো সমতল অঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)
৫০ হাজং ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, সুনামগঞ্জ

সূত্র: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর সংশোধিত তফসিল (গেজেট, ২৩ মার্চ ২০১৯); বাংলাপিডিয়া

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

আদিবাসী সংজ্ঞা কী?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণা (UNDRIP) অনুযায়ী, আদিবাসী বলতে এমন জনগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা কোনো ভূখণ্ডের মূল/সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আগমনের আগে থেকে সেখানে বসবাস করছে, নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বজায় রেখেছে, এবং নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়। বাংলাদেশ সরকার এই সংজ্ঞা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য মনে করে না, তাই সরকারিভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ পরিভাষা ব্যবহৃত হয়।

দুটি উপজাতির নাম কী?

বাংলাদেশের দুটি বহুল পরিচিত নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা ও মারমা — দুটোই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) সবচেয়ে জনবহুল নৃগোষ্ঠী এবং উভয়ই বৌদ্ধধর্মাবলম্বী।

আদিবাসীদের নাম কি কি?

বাংলাদেশে গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টি। এদের মধ্যে জনসংখ্যা ও পরিচিতির দিক থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো, ওঁরাও, তঞ্চঙ্গ্যা, মণিপুরি, খাসিয়া, রাখাইন, বম, ম্রো, খুমি, মুন্ডা ও হাজং। সম্পূর্ণ ৫০টির তালিকা এই পাতার উপরের টেবিলে দেওয়া আছে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো এই দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের ‘আদিবাসী’ নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত — এই বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা আদিবাসী স্বীকৃত নয় কেনো?

তথ্যসূত্র

  • ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ — bdlaws.minlaw.gov.bd (আইন মন্ত্রণালয়)
  • সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় — আইন ও তফসিল (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নামের গেজেট, ২০১৯) — moca.gov.bd
  • জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ — বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) — bbs.gov.bd

Leave a ReplyCancel reply

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading