উম্মুল মু’মিনীন রায়হানা (রাযি): এক নীরব মু’মিনার গল্প🌸
তিনি ছিলেন এক বন্দিনী, যাঁর হৃদয় মুক্ত হয়েছিল ঈমানের আলোয়। রায়হানা বিনতে শামউন (রাযি)–এর জীবনের সূচনা হয়েছিল বনু নাযীর গোত্রে, কিন্তু তাঁর পরিণতি হয়েছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর ঘরে। খন্দকের যুদ্ধের পর, যখন মুসলিম বাহিনী তাঁর গোত্রকে পরাজিত করে, তখন তিনি বন্দি হন। রাসূল ﷺ তাঁকে মুক্ত করেন এবং ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাঁর পরিচয় কখনো স্ত্রী, কখনো দাসী হিসেবে এসেছে—কিন্তু তাঁর আত্মা ছিল মু’মিনার। তিনি ছিলেন সেই নারী, যাঁর নীরব উপস্থিতি নবীজির ﷺ জীবনে এক গভীর ছায়া হয়ে ছিল।
নাম ও পরিচয় : তাঁর নাম রায়হানা। পিতার নাম শামউন। তিনি ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ইয়াহুদী বনু নাযীর গোত্রের মেয়ে।
বংশ তালিকা হল- রায়হানা বিনতে শামউন ইবনে যায়েদ, অন্য মতে রায়হানা বিনতে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে খানাফা ইবনে শামউন ইবনে যায়েদ।
প্রথম বিবাহ : তাঁর প্রথম বিয়ে হয় বনু কুরাইজা গোত্রের হাকামের সাথে। কিছুদিন পর হাকামের মৃত্যু হয়। ৬ষ্ঠ হিজরী সালে যখন মুসলমানরা বনু নাযীর ও বনু কুরায়জা গোত্রের সব কিছু দখল করে নেয় তখন রায়হানাকে যুদ্ধ বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। এরপর কিছুদিন তাকে কায়েসের কন্যা উম্মু মুনফিরের কাছে রাখা হয়।
রায়হানা (রাযি:) কে বিয়ে করতে রাসূল (সা:)-এর ইচ্ছা প্রকাশ!

রাসূল (সা:) বিদ্রোহী ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য সমগ্র আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রায়হানাকে আশ্রয় দিতে ও বিয়ে করতে মনস্থ করেন এবং তাঁকে বলেন, ‘তুমি আল্লাহ এবং রাসূলকে গ্রহণ করলে আমি তোমাকে আমার জন্য উপযুক্ত মনে করি। ‘রায়হানা বিনতে শামউন রাসূল (সা:)-এর এ প্রস্তাব আনন্দে গ্রহণ করেন। রায়হানা (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন কুরায়জা গোত্রের আল-হাকাম এর স্ত্রী, মুসলমানদের সাথে কুরায়জা গোত্রের সন্ধি চুক্তি ছিল। কিন্তু আহযাব যুদ্ধে কুরায়জা গোত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুশরিক কুরাইশদের পক্ষ গ্রহণ করে। ফলে আল্লাহর নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখলে অনন্যোপায় হয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে।
অতঃপর তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করা হয়। এ সূত্রে রায়হানা-এর স্বামী আল হাকাম নিহত হয় এবং তিনি বন্দিনী হন। প্রথমত তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং স্বীয় ইয়াহুদী ধর্মে বহাল থাকতে পছন্দ করেন। অতঃপর তাঁকে পৃথক করে উম্মুল মুনযির বিন্ত কায়েস-এর গৃহে রাখা হয়। কিছু দিন পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
উম্মুল মু’মিনীন রায়হানা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ:
রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হওয়ার বর্ণনা নিজেই প্রদান করিয়াছেন, যা ইব্ন সা’দ স্বীয় গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন রায়হানা (রা) বলেন, বন্দীদেরকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ (সা:) আমার নিকট আগমন করেন, অতঃপর আমাকে কাছে বসিয়ে বললেন, তুমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ কর তা হলে রাসূলুল্লাহ (সা:) নিজের জন্য তোমাকে গ্রহণ করবেন। আমি বললাম, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গ্রহণ করলাম। আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাকে আলাদা করে দেন এবং আমার তাঁর অন্যান্য পত্নীদিগের ন্যায় একটি গৃহেই আমাদের বাসর হয়। তিনি অন্যান্য স্ত্রীর ন্যায় সমভাবে পালা বণ্টন অনুযায়ী আমার গৃহে আগমন করতেন এবং আমার ওপর পর্দার হুকুম আরোপ করেন।
অপর এক বর্ণনা মতে, প্রথমত তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি অস্বীকার করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সা:) মনোক্ষুণ্ণ হন। অতঃপর তিনি একদিন সাহাবীদের নিয়ে তিনি বসলেন। তখন পিছন হতে জুতার আওয়াজ শুনে তিনি বললেন, ছালাবা ইবনে শুভা রায়হানা ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। অতঃপর ঠিকই তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সা:) কে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ দিল।
অপর বর্ণনা মতে, অতঃপর রাসূল (সা:) তাকে স্বাধীন করে দেন। অতঃপর তাকে বিবাহ প্রস্তাব দেন এবং হিজাব (পর্দা) মান্য করার কথা বলে। রায়হান তাঁর উত্তরে বলেন, হে রাসূল (সা:)! বরং আমাকে দাসী হিসেবে আপনার মালিকানা রাখুন। উহাই আপনার জন্য এবং আমার জন্য সহজতর হবে। তখন রাসূল (সা:) তাকে দাসী হিসেবে রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে যুক্তির কষ্ঠিপাথরে এ মতটি জোরালো বলে মনে হয় না। কারণ সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীন এ মহিলাকে যিনি দৈবক্রমে বন্দী ও দাসী হয়ে গিয়েছেন, আযাদ হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করলে তিনি যে উক্ত কাঙ্খিত প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বন্দীদশাকেই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবেন, ইহা এক রকম অসম্ভব।
রায়হানা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী এবং অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার ও পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারীণী। রাসূল (সা:) তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি যা চাইতেন রাসূল (সা:) তাকে তাই প্রদান করতেন। ফলে রাসূল (সা:) তাঁকে মুক্ত করে ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন।
ইবনে সা’আদের বর্ণনা মতে হিজরী ৬ষ্ঠ সালের মুহররম মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের ফলে ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের চমৎকার উন্নতি হয়। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুসম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়।
উম্মুল মু’মিনীন রায়হানা (রাযি:)-এর ইন্তেকাল!
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে, রাসূল (সা:) -এর ইন্তেকালের দশ মাস পূর্বে রায়হানা (রা) ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাত আল-বাকি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
“রায়হানা (রাযি)–এর ইন্তেকালের সময় নবীজি ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।”
উম্মুল মু’মিনীন রায়হানা (রাযি:) সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্নোত্তর!
রায়হানা (রাযি)–এর থেকে কোনো হাদীস বর্ণিত হয়েছে কি?
না, তাঁর থেকে সরাসরি কোনো হাদীস পাওয়া যায়নি।
তিনি রাসূল ﷺ–এর স্ত্রী ছিলেন কি?
কিছু সূত্রে বলা হয় তিনি দাসী ছিলেন, আবার কিছু সূত্রে বলা হয় রাসূল ﷺ তাঁকে বিবাহ করেছিলেন।