উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা বিনতে হারিস (রাযি) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর শেষ স্ত্রী, যাঁর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াহ আরও বিস্তৃত হয়। তিনি ছিলেন পরহেযগার, দানশীলা, এবং হাদীস বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী। তাঁর বিবাহের মাধ্যমে আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদের ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম হয়।
উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা) পূর্ব নাম ও পরিচয়!
পূর্বে তাঁর নাম ছিল বাররা। উম্মাহাতুল মু’মিনীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নাম রাখা হয় মায়মূনা। তাঁর পিতার নাম হারেস এবং মাতার নাম হিন্দ বিনতে আউফ।
উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা) এর বংশনামা! (পরিবার)

মায়মূনা ছিলেন কুরাইশ বংশের হাওয়াযিন গোত্রের হারেসের কন্যা; যিনি সা‘আসা’আ নামক এলাকায় বসবাস করতেন। অপরদিকে তিনি ছিলেন রাসূল (সাঃ) -এর চাচা আব্বাস (রা) -এর শালিকা এবং বিশ্বখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের খালা । অন্যদিকে তিনি উম্মুল ফযল লুবাবাতুস সুগরার বোন ছিলেন।
🟩 প্রথম বিবাহ: মাসউদ বিন আমর সাকাফীর সঙ্গে
মায়মূনা (রাযি)–এর মাসউদ বিন আমর বিন উমায়ের সাকাফীর সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে বনিবনা না হওয়াতে মাসউদ মায়মূনাকে তালাক দেন।
শিক্ষা: ইসলামে তালাকের পরও নারীর মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন থাকে।
🟩 দ্বিতীয় বিবাহ: আবূ রহম ইবনে আবদুল্লাহ
পরে আবূ রহম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ আবূ রহম সপ্তম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মায়মুনা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় তাঁর দুলাভাই আব্বাস (রা) উদ্যোগী হয়ে রাসূল (সাঃ) -এর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে রাসূল (সাঃ) ৫১ বছর বয়স্কা বৃদ্ধা মায়মুনাকে বিয়ে করতে রাজি হন।
শিক্ষা: বিধবা নারীর প্রতি ইসলামে সহানুভূতি ও পুনর্বিবাহের সুযোগ রয়েছে।
🟩 রাসূল ﷺ–এর সঙ্গে বিবাহ
সপ্তম হিজরী সালের জিলক্বদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি অনুসারে রাসূল (সা:) ওমরাতুল কাজা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা রওয়ানা হন। এ সময় জাফর ইবনে আবূ তালিবকে মায়মুনার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাঠানো হয় । তিনি আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে উকিল নিযুক্ত করেন। রাসূল (সাঃ) ওমরার উদ্দেশ্যে যে ইহরাম বাধেন, সেই অবস্থায় এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। আব্বাস (রা) এ বিয়ে পড়ান। ওমরা পালন শেষে মদীনা ফেরার পথে ‘সরফ‘ নামক স্থানে এ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ বিয়ের মোহরানা ধার্য করা হয় ৫০০ দিরহাম। কেউ কেউ বলেন মায়মূনা ছিলেন রাসূল (সাঃ) -এর সর্বশেষ স্ত্রী। তাদের মতে রায়হানা ও মারিয়া কিবতিয়া দাসী ছিলেন স্ত্রী নয়। তবে ঘটনাচক্রে মনে হয় তারাও স্ত্রী ছিলেন। তারা রাসূল (সাঃ) স্ত্রী ছিলেন এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত । এখানে তাদেরকে স্ত্রী হিসেবেই গ্রহণ করা হল।
শিক্ষা: নবীজি ﷺ আত্মীয়তা, দয়া এবং ইসলামের কৌশলগত বিস্তারের জন্য বিবাহকে ব্যবহার করেছেন।
🟩 বিবাহের ফলাফল ও প্রভাব
রাসূল (সা:) ও মায়মূনার এ বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আব্বাস ও খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম কবুল করেননি। মূলত এ বিয়ের ফলেই এ দু’জন বিশাল ব্যক্তিত্ব ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করেন। আসলে এ বিয়ের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী। এ প্রসঙ্গে স্যার সৈয়দ আমীর আলী বলেন, ‘মায়মুনাকে মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কায় বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর আত্মীয় ও পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর বয়স। এ বিয়ে আত্মীয়তার অবলম্বন হিসেবেই শুধু কাজ করেনি; অধিকন্তু এ ইসলামের জন্য লাভ করেছিল দু’জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইবনে আব্বাস এবং ওহুদের দুর্ভাগ্যজনক যুদ্ধে কুরাইশের অশ্বারোহী দলের সেনাপতি ও পরবর্তীকালে গ্রীক বিজেতা খালিদ বিন ওয়ালিদ।’ অনেকের ধারণা রাসূল (সাঃ) মায়মুনাকে বিয়ে না করলে খালিদ বিন ওয়ালিদ কোনোদিন হয়তো ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতেন না। সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এ বিয়ে ইসলামের ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছিল।
শিক্ষা: একটি বিবাহ শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সমাজ ও উম্মাহর জন্য কল্যাণকর হতে পারে।
উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রাযি:)-এর চরিত্র ও মাহাত্ম্য!
মায়মূনা অত্যন্ত পরহেযগার একজন মহিলা ছিলেন। তিনি আল্লাহর ভয়ে সর্বদা কম্পিত থাকতেন এবং কান্নাকাটি করতেন। তিনি ছোটখাট আদেশ নিষেধকে সমান গুরুত্ব দিতেন। একবার এক মহিলা অসুস্থ অবস্থায় মানত করল যে, “সুস্থ হলে বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে সালাত পড়বে। আল্লাহ তা’আলা তাকে রোগ মুক্ত করলে মানত পুরা করার উদ্দেশ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস গমনের জন্য মায়মুনার নিকট বিদায় নিতে আসে। মায়মুনা (রা) তাকে বুঝিয়ে বলেন যে, ‘অন্যান্য মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে মসজিদে নব্বীতে সালাত আদায়ের সওয়াব হাজার গুণ বেশি। তুমি এখানে থেকেই মসজিদে নববীতে সালাত আদায় কর।’
তাঁর সম্পর্কে আয়েশা (রাযি:) বলেন:
“মায়মূনা (রাযি) ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে পরহেযগার নারীদের একজন। তিনি আল্লাহর ভয়ে সর্বদা কম্পিত থাকতেন।”
— আয়েশা (রাযি), ইবনু সা’দ, আল-তাবাকাত।
একবার তাঁর এক আত্মীয় বেড়াতে আসেন। কিন্তু তার মুখ দিয়ে মদের গন্ধ আসছিল। তাই মায়মুনা (রা) ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘ভবিষ্যতে আর কখনো আমার কাছে আসবে না ৷’
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে মায়মূনা (রা)-এর অবদান!
মায়মূনা (রা) রাসূল (সা:)- এর ইন্তেকালের পরও দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। মহানবী (সা:)-এর অনেক হাদীসই উন্মুল মু’মিনীনদের মাধ্যমে পরবর্তীদের কাছে সম্প্রসারিত হয়েছে। মায়মুনা (রা)-এর অবদান এ ক্ষেত্রে মোটেই নগণ্য নয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) হতে তিনি হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন এবং তা বর্ণনাও করেছেন।
ইবনুজ জাওযী (র) বলেন : মায়মুনা (রা) থেকে ৭৬টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে সহীহাইন তথা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ১৩টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ৭টি, ইমাম বুখারী এককভাবে ১টি এবং ইমাম মুসলিম (র) এককভাবে ৫টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ২১টি, মুসলিমে ১৮টি, তিরমিযীতে ৪টি, আবু দাউদে ১৫টি, নাসাঈতে ২৬টি এবং ইবনে মাজায় ১১টি সংকলিত হয়েছে। তাঁর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ, আবদুর রহমান ইবনে সায়েব, ইয়াযিদ ইবনে আছম প্রমুখ সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্বলিত।
নিম্নে তাঁর থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস উল্লেখ করা হলো –
🟩 হাদীস ১: নবীজি ﷺ বকরীর কাঁধের গোশত খেয়ে অযু ছাড়াই সালাত আদায় করেন
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَكَلَ عِنْدَنَا كَتِفًا ثُمَّ صَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأَ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ ) তাঁর নিকট (একদা) বকরীর কাঁধের মাংস খেলেন, অত:পর সালাত পড়লেন, কিন্তু অযু করলেন না।
সূত্র: সহীহ মুসলিম ৫৩৫, আবু দাউদ ১৮৪৩, তিরমিযী ৮৪৫, ইবনু মাজাহ ১৪১১
শিক্ষা: খাবার গ্রহণের পর অযু না করেও সালাত আদায় করা বৈধ, যদি অযু ভঙ্গের কোনো কারণ না থাকে।
🟩 হাদীস ২: ইঁদুর ঘিতে পড়লে কী করতে হবে
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ فَأْرَةٍ سَقَطَتْ فِي سَمْنٍ، فَقَالَ: الْقُوهَا وَمَا حَوْلَهَا وَكُلُوا سَمَنَكُمْ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ )-কে ঘি বা মাখনে ইঁদুর পতিত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো–একটি ইঁদুর ঘিতে পড়ে গেছে, কী করা উচিত? তিনি বললেন: “ইঁদুর এবং তাঁর আশপাশের অংশ ফেলে দিয়ে তোমরা তোমাদের ঘি খেতে পার।”
সূত্র: সহীহ বুখারী ২৩৫
শিক্ষা: ইসলামে সহজতা ও পরিচ্ছন্নতার নীতি রয়েছে। কঠিন খাবারে মৃত প্রাণী পড়লে আক্রান্ত অংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশ ব্যবহার করা যায়।
🟩 হাদীস ৩: নবীজি ﷺ ঋতুস্রাব অবস্থায় স্ত্রীকে শয়নসঙ্গী করতেন
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَنْضَجِعُ مَعِي وَأَنَا حَائِضٌ وَبَيْنِي وَبَيْنَهُ ثَوْبٌ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ )- আমার ঋতুস্রাব অবস্থায় আমার সাথে শয়ন করতেন। তাঁর ও আমার মাঝে কাপড়ের ব্যবধান থাকতো।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম ২৯৫
শিক্ষা: ইসলামে স্ত্রীকে ঋতুস্রাব অবস্থায়ও সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া হয়। এটি নবীজির ﷺ রাহমত ও রুচিশীল আচরণের দৃষ্টান্ত।
🟩 হাদীস ৪: রাসূল ﷺ–এর জানাবতের গোসলের পদ্ধতি
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : أَدْنَيْتُ لِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم غُسْلَهُ مِنَ الْجَنَابَةِ، فَغَسَلَ كَفَّيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا، ثُمَّ أَدْخَلَ فِي الْإِنَاءِ، ثُمَّ أَفْرَغَ بِهِ عَلَى فَرْجِهِ وَغَسَلَهُ بِشِمَالِهِ، ثُمَّ ضَرَبَ بِشِمَالِهِ الْأَرْضَ فَدَلَكَهَا دَلْكًا، ثُمَّ تَوَضَّأَ وُضُوءَ لِلصَّلَاةِ، ثُمَّ أَفْرَغَ عَلَى رَأْسِهِ ثَلَاثَ حَفَنَاتٍ مِلْءَ كَفَّيْهِ، ثُمَّ غَسَلَ سَائِرَ جَسَدِهِ، ثُمَّ تَنَحَّى عَنْ مَقَامِهِ ذَلِكَ فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ بِالْمِنْدِيلِ فَرَدَّهُ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ ) এর জানাবতের গোসল নিকট থেকে লক্ষ্য করেছি। তিনি প্রথমে দু’হাতের কব্জি দু’তিনবার ধৌত করেন। অতঃপর হাত পাত্রে দিয়ে লজ্জাস্থানে পানি দেন এবং বাম হাত দিয়ে তা ভালভাবে পরিষ্কার করেন। অতঃপর সালাতের ন্যায় অযূ করেন। এরপর তিন কোষ পানি মাথায় দিলেন, অতঃপর সমস্ত শরীর ধৌত করলেন। এরপর ঐ স্থান থেকে সরে এসে পা ধৌত করেন। অতঃপর আমি রুমাল নিয়ে আসি তবে তিনি তা গ্রহণ করেননি।”
সূত্র: সহীহ বুখারী ২৫৯, মুসলিম ৩১৭, আবু দাউদ ২৪৫, নাসাঈ ২৫৩, ইবনু হিব্বান ১১৯০
শিক্ষা: রাসূল ﷺ–এর গোসলের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সুসংগঠিত এবং শিক্ষণীয়। এটি জানাবতের গোসলের সুন্নত পদ্ধতির দৃষ্টান্ত।
🟩 হাদীস ৫: রাসূল ﷺ–এর সিজদার সময় হাতের অবস্থান
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : كَانَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِذَا سَجَدَ لَوْ شَاءَتْ بَهِيمَةٌ أَنْ تَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ لَمَرَّتْ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ ) যখন সিজদা দিতেন, তখন কোন বকরীর বাচ্চা তাঁর দু’হাতের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে করতে পারতো।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম ৪৯৬, আবু দাউদ ৮৯৮, নাসাঈ ১১০৯
শিক্ষা: নবীজি ﷺ সিজদার সময় হাত এমনভাবে প্রসারিত করতেন যাতে তা শরীর থেকে দূরে থাকত। এটি সিজদার আদর্শ ভঙ্গি এবং খুশু ও বিনয় প্রকাশের দৃষ্টান্ত।
🟩 হাদীস ৬: ক্রীতদাসী মুক্ত করার চেয়ে আত্মীয়কে দান করা উত্তম
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ (رض) أَنَّهَا اعْتَقَتْ وَلِيْدَةً فِي زَمَانِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم، فَذَكَرَتْ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللهِ، فَقَالَ: لَوْ أَعْطَيْتِهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لِأَجْرِكِ
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রাযি:) রাসূলের যামানায় একজন ক্রীতদাসীকে আযাদ করে মুক্ত করে দেন। অত:পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ )-এর নিকট এ কথা বর্ননা করলে তিনি বললেন, তুমি যদি ঐ অর্থ তোমার ভাই ইবিনুল হারিসকে দিতে তবে অধিক সাওয়াব পেতে।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম ২৩১৭
শিক্ষা: আত্মীয়কে দান করা সাধারণ সদকাহ অপেক্ষা অধিক সাওয়াবের কাজ। এটি ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও সেবার গুরুত্ব তুলে ধরে।
🟩 হাদীস ৭: মৃত পশুর চামড়া ব্যবহার করা বৈধ
আরবি: عَنْ مَيْمُونَةَ (رض) قَالَتْ : اُهْدِى لِمُوَلَاةِ لَنَا شَاةٌ مِّنَ الصَّدَقَةِ، فَمَاتَتْ، فَمَرَّ بِهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : أَلَا بَعْتُمْ إِهَابَهَا أى جُلُودَهَا، فَاسْتَمْتَعْتُم بِهِ ؟ فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّهَا مَيْتَةٌ، قَالَ : إِنَّمَا حَرَامٌ أَكْلُهَا.
বাংলা সারাংশ: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের জনৈক দাসীকে একটি বকরী উপহার দেয়া হলো। বকরীটি মরে গেল। রাসূল (ﷺ ) মরা বকরীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, বললেন : তোমরা কি এর চামড়া পরিশোধন (দাবাগত) করে তা ব্যবহার করবে না? তাঁরা বললেন, হে রাসূল (ﷺ ) এটা তো মৃত। নবী (ﷺ ) বললেন, এর গোশত খাওয়া হারাম, চামড়া ব্যবহার করা নয়।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম ৩৬৩, সুনান আবু দাউদ ৪১২০
শিক্ষা: ইসলামে মৃত পশুর চামড়া ডাবাগ করার মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য হয়ে যায়। এটি পরিচ্ছন্নতা ও উপকারের নীতিকে তুলে ধরে।
তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীস থেকে তাঁর ফিকহী সূক্ষ্মতার পরিচয় মেলে। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীস উল্লেখ করা হলো : একবার ইবনে আব্বাস (রা) মলিন মুখে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বৎস! তোমার কি হয়েছে? বললেন, উম্মু আম্মার (তাঁর স্ত্রী) আমার চুলে চিরুনী করে দিত, অথচ সে আজ-কাল মাসিক স্রাবে ভুগছে। তিনি বললেন, কী চমৎকার! আমার ঐ রকম দিনে নবী সালমা আমার কোলে মাথা মুবারক রেখে শুইতেন, কুরআন শরীফ পড়তেন, আমি ঐ অবস্থায় মসজিদে বিছানা (চাটাই) রেখে আসতাম । বৎস! হাতেও কি এসব হয় কখনও?
উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রাযি:)-এর ইন্তেকাল!
রাসূল (সা:)- এর পদাঙ্ক অনুসরণে সতত তৎপর, পরোপকারী, দানশীলা, গোলাম আযাদকারিণী মায়মুনা (রা) হিজরী ৬১ সালে ‘সরফ’ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। উল্লেখ্য যে, এ ‘সরফে’ তাঁর বিয়ে হয়েছিল। এটা তাঁর জীবন ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা।
ওফাতের সময় তিনি আয়েশা ও উম্মু সালামা (রা)-কে ডেকে এনে বলেন, সাধারণত সতীনদের মধ্যে যা হয়ে থাকে মাঝে মধ্যে আমাদের মধ্যেও সে রকম হয়ত হয়ে যেত, আমি এ ব্যাপারে লজ্জিত। আপনারা আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
আয়েশা (রা) বলেন, আমি তাকে ক্ষমা করে তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করি। এতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তুমি আমাকে খুশী করেছ আল্লাহ তোমায় খুশী করুন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তাঁর জানাযার সালাত পড়েছিলেন এবং তিনি লাশ কবরে নামিয়েছিলেন। লাশ বহনের সময় আবদুল্লাহ বলেছিলেন,
“সাবধান! এ উম্মুল মু’মিনীন–এর লাশ। বেয়াদবী করো না, এমনকি তোমরা নড়াচড়াও করো না। খুব যত্ন সহকারে বহন করবে।”
— আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি)
🧠 সাধারণ প্রশ্নোত্তর: উম্মুল মু’মিনীন মায়মূনা (রাযি)
মায়মূনা (রাযি)–এর কতটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে?
মায়মূনা (রাযি)–এর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় ৭৬টি, যার মধ্যে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ১৩টি সংকলিত হয়েছে।
তিনি নবীজি ﷺ–এর সঙ্গে কখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন?
সপ্তম হিজরীর জিলক্বদ মাসে, হুদায়বিয়ার ওমরার সময় নবীজি ﷺ তাঁর সঙ্গে বিবাহ করেন।
মায়মূনা (রাযি)–এর পূর্ববর্তী স্বামী কে ছিলেন?
তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন মাসউদ বিন আমর সাকাফী, এবং দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন আবূ রহম ইবনে আবদুল্লাহ।
তিনি কোথায় ইন্তেকাল করেন?
তিনি মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি “সারফ” নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন, এবং সেখানেই দাফন করা হয়।