যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) জীবনী ও হাদীস

যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) ছিলেন রাসূল ﷺ-এর স্ত্রী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত। তিনি ছিলেন পরহেযগার, দানশীল ও ইবাদতে নিষ্ঠাবান—তাঁর জীবন আদর্শ নারীত্ব ও ঈমানের প্রতিচ্ছবি। আজকে আমরা জানবো যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর বর্ণিত কিছু হাদীস।

🟢 আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে:

  • রাসূল ﷺ ও যয়নব (রাঃ)-এর বিবাহের ঐশী দিক
  • সাহাবিয়াতদের তাকওয়া ও পরহেযগারিতা
  • নারীর ইদ্দত ও শোক পালনের শরয়ি বিধান
  • দানশীলতা, সেবা ও ভালোবাসার উদাহরণ

উম্মুল মু’মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) এর সংক্ষিপ্ত জীবনি!

যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ)

‘অতঃপর যায়েদ যখন তার সাথে স্বীয় প্রয়োজন সমাপ্ত করল তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পুরো করার পর মুখ ঢাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের ওপর কোনো দোষারোপ না চলে। আল্লাহর ইচ্ছে তো পূরণ হবেই।’

আল্লাহ তা’আলা আসমানে আমার আকুল সম্পন্ন করেছেন, আর আমার বিয়েতেই নবীজী গোশত-রুটি দিয়ে ওলীমার ব্যবস্থা করেছেন।’ কথাগুলো তাঁর বিয়ের ব্যাপারে গর্বভরে বলতেন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)।

নাম ও পরিচয়: তাঁর নাম যয়নব। পূর্বে তাঁর নাম ছিল বুররাহ। ডাক নাম উন্মু হাকাম। বাবার নাম জাহান। তিনি তৎকালীন আরবের সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল উমাইয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব। অর্থাৎ যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) ছিলেন রাসূল (সাঃ) আপন ফুফাতো বোন।

বংশ তালিকা : তাঁর বংশ তালিকা ছিল এ রকম, যয়নব বিনতে জাহাশ ইবনে রুবাব ইবনে ইয়া’মার ইবনে সোবরা ইবনে মুবরা ইবনে কাসীর ইবনে গানাম ইবনে দুপরান ইবনে আসাদ খুযাইমা।

ইসলাম গ্রহণ : পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনি নবুওয়্যাতের সূচনালগ্নে ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সূত্রে তিনি সাবেকুনাল আউয়ালুনদের তথা প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীর পর্যায়ভুক্ত হওয়ায় গৌরব অর্জন করেছিলেন। পিতা জাহাশ পূর্বেই ইন্তেকাল করেন। তাই তিনি এ সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হন।

হিযরত: অবিশ্বাসী মক্কাবাসীদের অত্যাচার যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে যয়নব (রা) আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরে সেখান থেকে মদীনায় হিজরত করেন। নবী (সাঃ) এর অভিভাকত্বাধীনে অবস্থান করেন।

দাস প্রথা ও যায়েদ : তৎকালীন আরব সমাজে অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর সাথে বাজারে মানুষও বেচাকেনা হতো। যাদেরকে বাজারে পণ্য সামগ্রীর মতো বেচাকেনা করা হতো তারা ক্রীতদাসরূপে পরিচিত ছিল। নবুওয়্যাতের পূর্বে ও সূচনালগ্নেও এ প্রথা চালু ছিল। পরবর্তীকালে রাসূল (সাঃ) খোলাফায়ে রাশেদা, সাহাবাগণ ও পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণ ধীরে ধীরে এ কু-প্রথার বিলুপ্তি সাধন করেন।

সেই জাহেলী যুগের প্রথা অনুযায়ী খাদীজা (রা)-এর ভাতিজা হাকীম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ ইবনে হারিসা নামের এক দাস বালককে কিনে এনে ফুফুকে উপহার হিসেবে দিলেন। পরবর্তীতে খাদীজা প্রিয় দাস যায়েদকে স্বামী মুহাম্মদ (সা:)-এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। কিন্তু দয়ার সাগর, সর্বমানবতার মুক্তিদূত, রাহমাতুল্লিল আলামীন তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। এমনকি আপন পালক পুত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করলেন। রাসূল (সাঃ) এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়েদ ইসলাম কবুল করলেন এবং অচিরেই নিজেকে কুরআন হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তুললেন।

যায়েদের সাথে যয়নবের বিয়ে : এ ক্রীতদাস যায়েদ (রা)-এর সাথে রাসূল (সা:) এর আপন ফুফাতো বোন অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর বিয়ে দেন। রাসূল (সা:)- এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে সমতা ফিরিয়ে আনা । সব মুসলমান সমান, সকলে ভাই ভাই, আশরাফ-আতরাফের কোনো বালাই ইসলামে নেই। ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি একজন সদ্য আযাদপ্রাপ্ত ক্রীতদাসের সাথে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ, কুরাইশ বংশের মেয়ে তাও আবার নিজেরই ফুফাতো বোনকে বিয়ে দেন।

কিন্তু নারীসূলভ মানসিকতার কারণে যয়নব (রা) এ বিয়েকে ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে বিয়ের প্রায় এক বছর একত্রে বসবাস করার পরও তাদের মধ্যে সার্বিক অর্থে কোনো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। ফলে যায়েদ (রা) প্রচণ্ড অশান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আসলে যয়নব (রা) বিয়ের আগেই রাসূল (সাঃ) -এর খেদমতে যায়েদ (রা) সম্বন্ধে আরজ করেছিলেন, ‘আমি তাঁকে আমার জন্য পছন্দ করি না।’ তিনি শুধু রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ মেনে নেয়ার জন্যই এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন।

যায়েদ-যয়নৰ দ্বন্দ্ব : কিন্তু যখন দু’জনের মধ্যে মোটেই বনিবনা হচ্ছিল না তখন একদিন যায়েদ (রা) এসে রাসূল (সাঃ)কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যয়নব আমার কথার ওপর কথা বলে তর্ক করে, আমি তাকে তালাক দিতে চাই।’ একথা শুনে রাসূল (সাঃ) যায়েদ (রা)-কে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন। কারণ তালাক দেয়া শরীয়তে জায়েয হলেও অপছন্দনীয়। এমন কি বৈধ কাজসমূহের মধ্যে এ কাজটি নিকৃষ্টতম ও সর্বাধিক ঘৃণিত।

যে কারণে রাসূল (সাঃ) তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখতে পেয়েছ?’ যায়েদ উত্তর করলেন ‘না!’ কিন্তু আমি তার সংগে বসবাস করতে পারবো না।’ রাসূল (সাঃ) তাঁকে আদেশের সুরে বললেন, ‘বাড়িতে গিয়ে তোমার স্ত্রীর দেখাশোনা কর, তার সংগে ভালো আচরণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। কারণ আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সদাচরণ কর আর আল্লাহকে ভয় কর।‘ কিন্তু তাদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত যায়েদ (রা) রাসূল (সাঃ) নিষেধ করার পরও যয়নব (রা)-কে তালাক দিয়ে দেন । এ বিষয়টি সূরা আহযাবে এভাবে বর্ণিত হয়েছে-

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَانْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ الله .

অর্থ : ‘হে নবী! সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তুমি সে ব্যক্তিকে বলেছিলেন যে, যার প্রতি আল্লাহ এবং তুমি অনুগ্রহ করেছিলে, তোমার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় কর।’ [সূরা-৩৩ আহযাব : আয়াত-৩৭]

নিরীহ যয়নব : যায়েদ (রা) যখন যয়নব (রা)-কে তালাক দিলেন তখন জনগণের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা চলতে লাগল, ক্রীতদাসের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কে-ই বা বিয়ে করবে। সত্যি কথা বলতে কি, তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর যয়নব (রা) হয়ে গেলেন অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্রী! এ অবস্থা থেকে যয়নব (রা)-কে রেহাই দিতে আল্লাহ রাসূল (সাঃ) এর সাথে তাঁকে বিয়ে দেয়ার মনস্থ করলেন।

তাই যয়নব (রা) তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর ইদ্দত পুরা হলে রাসূলে করীম (সাঃ) তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু জাহেলী প্রথা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যায়েদ (রা) ছিলেন রাসূল (সা:) – এর পালক পুত্র। তৎকালীন আরবের লোকজন পালক পুত্রকে আপন পুত্রের মতই মনে করত। যায়েদ (রা) ঐ সময়ে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ (সাঃ) নামেই পরিচিত ছিলেন। ফলে রাসূল (সাঃ) অপবাদের আশংকা করছিলেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তর্জন গর্জনও ছিল।

কুপ্রথার মূলৎপাটনে আয়াত নাযিল : যা হোক, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চাচ্ছিলেন সকল প্রকার কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে নির্ভেজাল একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাসূল (সাঃ) দুনিয়াতে প্রেরণ করেন। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবকিছু নিরসনকল্পে ঘোষণা করলেন-

مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا

অর্থ : ‘তোমাদের পুরুষদের মধ্যে মুহাম্মদ (সাঃ) কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী । [সূরা আহযাব ৩৩: আয়াত ৪০]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ঘোষণা করেন-

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ م…ِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ۚ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

‘তুমি অন্তরে তা গোপন করছিলে, যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, তুমি মানুষকে ভয় করছ, অথচ আল্লাহই তো বেশি ভয় পাওয়ার যোগ্য।’ [সূরা আহযাব ৩৩: আয়াত ৩৭]

বিয়ের প্রস্তাব যায়েদ কর্তৃক : রাসূল নিশ্চিন্ত হলেন। এরপর তিনি যায়েদকেই পাঠালেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যয়নব (রা)-এর কাছে। তিনি যয়নব (রা)-এর গৃহে গিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তোমাকে বিয়ে করতে চান।’ তিনি বললেন, ‘এটা খুব ভালো কথা। তবে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি ইস্তেখারায় বসে গেলেন। ইতোমধ্যেই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সাঃ) ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ব্যাপারে আয়াত নাযিল হলো-

فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوِّجُنكَهَا لكَى لا يَكُونَ عَلَى لِكَيْ الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَانِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا ، وَكَانَ أَمْرُ الله مَفْعُولاً .

অর্থ: ‘অতঃপর যায়েদ যখন তার সাথে স্বীয় প্রয়োজন সমাপ্ত করল তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম। যাতে প্রয়োজন পুরো করার পর মুখ ডাকা পুত্রের স্ত্রীদের ব্যাপারে মু’মিনদের ওপর কোনো দোষারোপ না চলে। আল্লাহর ইচ্ছা তো পূরণ হবেই। [সূরা ৩৩ আযহাব, আয়াত ৩৭)। 
সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে, ‘তখন আমি তাঁকে তোমার নিকট বিয়ে দিলাম।’ এমন কথা নাযিল হওয়ার পর বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হল। সময়টা ছিল ৫ম হিজরীর জিলকদ মাস । এ জন্যেই যয়নব (রা) গর্ব করে বলতেন, ‘আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন।’

বিয়ের অনুষ্ঠান : এ বিয়েতে বেশ আনন্দ করা হয়। বৌভাত অনুষ্ঠানে আনসার ও মুহাজিরদের প্রায় তিনশ জনকে দাওয়াত করা হয়। খাওয়ার মেনু ছিল গোশত-রুটি। একেক বারে দশজন করে লোক খেতে বসছিলেন। কিন্তু শেষ দলের লোকজন খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বসেছিলেন। তারা নানা গল্পে মেতে উঠলেন। ফলে রাত ক্রমেই গভীর হতে লাগল ।

পর্দার আয়াত : রাসূল (সা:) লজ্জার কারণে মেহমানদেরকে উঠতে বলতে পারছিলেন না, অথচ খুব অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। ঠিক এ সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্দার আয়াত নাযিল হয়। ইরশাদ হচ্ছে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَدۡخُلُوۡا بُیُوۡتَ النَّبِیِّ اِلَّاۤ اَنۡ یُّؤۡذَنَ لَكُمۡ اِلٰی طَعَامٍ غَیۡرَ نٰظِرِیۡنَ اِنٰىهُ ۙ وَ لٰكِنۡ اِذَا دُعِیۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡا فَاِذَا طَعِمۡتُمۡ فَانۡتَشِرُوۡا وَ لَا مُسۡتَاۡنِسِیۡنَ لِحَدِیۡثٍ ؕ اِنَّ ذٰلِكُمۡ كَانَ یُؤۡذِی النَّبِیَّ فَیَسۡتَحۡیٖ مِنۡكُمۡ ۫ وَ اللّٰهُ لَا یَسۡتَحۡیٖ مِنَ الۡحَقِّ ؕ وَ اِذَا سَاَلۡتُمُوۡهُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡهُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ ذٰلِكُمۡ اَطۡهَرُ لِقُلُوۡبِكُمۡ وَ قُلُوۡبِهِنَّ ؕ وَ مَا كَانَ لَكُمۡ اَنۡ تُؤۡذُوۡا رَسُوۡلَ اللّٰهِ وَ لَاۤ اَنۡ تَنۡكِحُوۡۤا اَزۡوَاجَهٗ مِنۡۢ بَعۡدِهٖۤ اَبَدًا ؕ اِنَّ ذٰلِكُمۡ كَانَ عِنۡدَ اللّٰهِ عَظِیۡمًا ﴿۵۳﴾

অর্থ : ‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা নবী গৃহে প্রবেশ করবে না। অবশ্য দাওয়াত পেলে যাবে, তবে ডাকার আগে গিয়ে অনর্থক বসে থাকবে না। বরং ডাকবার পরে যাবে, খাওয়ার পরে চলে আসবে। বসে গল্প-গুজবে রত হবে না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদেরকে বলতে সংকোচ বোধ করেন, কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না। তোমরা নবীর স্ত্রীদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।’ [সূরা-৩৩ আহযাব : আয়াত-৫৩]

এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল (সাঃ) দরজায় পর্দা ঝুলিয়ে দেন। ফলে লোকদের ভেতরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। রাসূল (সা:) ও যয়নব (রা)-এর বিয়ের ফলে আরবের দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে, তা হল-পালক পুত্র আদৌ আপন পুত্র হতে পারে না ৷ ফলে তার স্ত্রীকে বিয়ে করাও দোষণীয় নয়। ইসলাম পরিষ্কারভাবে ১৪ জন নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। বাকি সকলকে বিয়ে করা জায়েয। এ ১৪ জনের মধ্যে পালক পুত্রের স্ত্রীর কথা নেই।

বিয়ের বৈশিষ্ট্য : এ বিয়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা হল-

  • ১. জাহেলী যুগে পালক পুত্র আসল পুত্রের মর্যাদাসম্পন্ন ছিল। এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে।
  • ২. লোকদেরকে আদেশ করা হয় যে, কাউকে তার প্রকৃত পিতা ব্যতীত অন্যের সাথে পিতৃ পরিচয়ে সম্পর্ক করা যাবে না ।
  • ৩. মানুষের মধ্যে উঁচু-নীচুর কোনো ব্যবধান থাকবে না ।
  • ৪. আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যয়নব (রা)-এর বিয়ে দেন।
  • ৫. যয়নবের সাথে বিয়ের সময় পর্দার আয়াত নাযিল হয় এবং পর্দা প্রথার প্রচলন হয়।
  • ৬. একমাত্র যয়নবের বিয়েতেই জাকজমকপূর্ণভাবে অলিমা অনুষ্ঠান করা হয় । শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে জয়নব (রা) ছিলেন ক্ষুদ্রকায় কিন্তু সুন্দরী ছিলেন । সাথে সাথে শোভন শারীরিক গঠন ছিল তাঁর।

চরিত্র মাধুর্য : তিনি অত্যন্ত দ্বীনদার, পরহেযগার, উদার, দয়ার্দ্রচিত্ত, বিনয়ী ও সৎ স্বভাবী ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পরিশ্রমী একজন মহিলা। তিনি হস্তশিল্পের কাজে খুবই পারদর্শী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে রোজগার করে সংসার চালাতেন । তাঁর পরহেযগারিতার ব্যাপারে রাসূল (সা:)-এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। একবার সাহাবীদের মধ্যে রাসূল (সাঃ) কিছু মাল বিতরণ করছিলেন। কিন্তু স্ত্রী যয়নবের পরামর্শক্রমে তা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখেন। এতে ওমর (রা) রাগ করে যয়নবকে ধমক দিলে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘ওমর! যয়নবকে কিছু বলো না । সে খুবই আল্লাহ ভীরু ও ইবাদতের সময় ক্রন্দনশীলা।

একবার ওমর (রা) বায়তুল মাল থেকে যয়নবকে এক বছরের খরচ পাঠিয়ে দেন। যয়নব (রা)-এর সামান্য অংশ একটি চাদরে ঢেকে রেখে বাকি সমস্ত কিছু গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়ার জন্য পরিচারিকাকে নির্দেশ দেন। এ সময় পরিচারিকা আরজ করলেন, আম্মাজান! গরীবদের মাঝে আমিও একজন ৷ সুতরাং এ মাল থেকে আমিও কিছু পেতে পারি। বিবি যয়নব বললেন, চাদরে ঢাকা যা আছে সবই তোমার, বাকিগুলো তুমি দান করে দাও।’

সব কিছু দান করার পর তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে আরজ করলেন, “ইয়া রাব্বাল আলামীন! বায়তুল মাল থেকে দান যেন আর আমাকে গ্রহণ করতে না হয়।’ তাঁর এ মুনাজাত কবুল হয় অর্থাৎ ঐ বছরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য : যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্না মহিলা। মুহাম্মদ ইবনে ওমর বর্ণনা করেন যে, ‘একদিন যয়নব (রা) নবীজীকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার অন্য স্ত্রীদের মতো নই। তাঁদের মধ্যে একজনও এমন নেই, যার বিয়ে পিতা-ভাই বা বংশের অন্য কারো অভিভাবকত্বে সম্পন্ন হয়নি। একমাত্র আমিই ব্যতিক্রম। আল্লাহ তা’আলা আমাকে আসমান থেকে আপনার স্ত্রী করেছেন।’ আয়েশা (রা) বলেছেন-

مَا رَأَيْتُ امْرَأَةً قَطُّ خَيْرًا فِي الدِّينِ مِنْ زَيْنَبَ

‘আমি দ্বীনের ব্যাপারে যয়নব (রা) থেকে উত্তম কোনো মহিলা দেখিনি।’ (আল-ইসতীয়াব-২/৭৫৪ )

মূসা ইবনে তারেক যয়নব (রা) সম্পর্কে আয়েশা (রা) থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘দ্বীনদারী, তাকওয়া, সত্যবাদিতা, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সহানুভূতি, দানশীলতা এবং আত্মত্যাগে তাঁর চেয়ে উত্তম মহিলা আর কেউ ছিল না।’

আয়েশা (রা) তাঁর সম্বন্ধে আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা যয়নব বিনতে জাহাশের প্রতি রহম করুন। সত্যি দুনিয়ায় তিনি অনন্য মর্যাদা লাভ করেছেন । আল্লাহ তা’আলা স্বীয় নবীর সাথে তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রসঙ্গে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে।
তাঁর সম্বন্ধে উম্মু সালামা (রা) বলেন-

قالت أم سلمة رضي الله عنها: كَانَتْ زَيْنَبُ صَالِحَةً، صَوَّامَةً، قَوَّامَةً

“তিনি ছিলেন অতি নেককার, অধিক সিয়াম পালনকারী এবং অতি ইবাদতকারী।’

হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) অবদান!

যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) মর্যাদা সম্পন্ন মহিলা সাহাবী ছিলেন। বিভিন্ন কর্মের পাশাপাশি তিনি অল্প পরিমাণে হলেও নবী (সাঃ) থেকে হাদীস শিক্ষা ও তা বর্ণনা কার্যেও অবদান রেখেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে ১১টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার (র) আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যয়নব (রা) নবী (সা:) থেকে কতিপয় হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস পুনরুক্তিসহ বুখারীতে ৫টি, মুসলিমে ৩টি, তিরমিযীতে ২টি, আবু দাউদে ২টি, নাসাঈতে ২টি ও ইবনে মাজায় ২টি সংকলিত হয়েছে।
তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

🟩 হাদীস ১: “অন্তিম ফিতনার পূর্বাভাস: ইয়াজুজ-মাজুজ ও সমাজে অনাচারের বিস্তার”

عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: اسْتَيْقَظَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ النَّوْمِ مُحْمَرًّا وَجْهُهُ يَقُولُ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ، فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ، وَحَلَقَ بِإِصْبَعِهِ الْإِبْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا. قَالَتْ زَيْنَبُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَهْلِكُ وَفِينَا الصَّالِحُونَ؟ قَالَ: نَعَمْ، إِذَا كَثُرَ الْخَبَثُ

অর্থ: যয়নব বিনত জাহাশ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : নবী একদা রক্তিম বর্ণের চেহারা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তিনি বললেন : আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আরবদের জন্য বিপদ সমাগত। ইয়াজুজ-মাজুজ এর প্রাচীরের ছিদ্র আজ এ পর্যন্ত উন্মুক্ত করে ফেলা হয়েছে (বর্ণনাকারী সুফিয়ান) তাঁর হাতের আঙ্গুল দিয়ে ৯০ বা ১০০-এর আকৃতি করে দেখালেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলো- আমরাও কি ধ্বংস হয়ে যাবো অথচ আমাদের মাঝে পুণ্যবানগণ রয়েছে? নবী (সাঃ) বলেলেন : হ্যাঁ, যখন অন্যায় অধিক হবে, তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। (মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৮)

🟩 হাদীস ২: “ইস্তিহাযার সময়ে ইবাদতের বিধান: যয়নব (রাঃ)-এর প্রশ্ন ও নবী ﷺ-র নির্দেশনা”

عَنْ زَيْنَبَ بْنَتِ جَحْشٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَا مُسْتَحَاضَةٌ.
فَقَالَ: تَجْلِسُ أَيَّامَ أَقْرَانِهَا، ثُمَّ تَغْتَسِلُ، وَتُؤَخِّرُ الظُّهْرَ وَتُعَجِّلُ الْعَصْرَ، وَتَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيهِمَا،
وَتُؤَخِّرُ الْمَغْرِبَ وَتُعَجِّلُ الْعِشَاءَ، وَتَغْتَسِلُ وَتُصَلِّيهِمَا جَمِيعًا، وَتَغْتَسِلُ لِلْفَجْرِ.

অর্থ: যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন : আমি নবী (সাঃ) বললাম, যে, আমি ইস্তিহাযা (অনিয়ন্ত্রিত স্রাব)-এ আক্রান্ত । নবী (সাঃ) বললেন : তুমি তোমার পূর্ব নির্ধারিত হায়েযর দিনগুলোতে অপেক্ষা করবে। অতঃপর গোসল করে যোহরকে বিলম্ব করে আসরকে তাড়াতাড়ি করবে। অতঃপর গোসল করে উভয় ওয়াক্ত সালাত পড়বে। অনুরূপ মাগরিবকে বিলম্ব করে এশা কে এগিয়ে এসে গোসল করে উভয় সালাত একত্রে পড়বে। আর ফজরের জন্যও আলাদা গোসল করবে। (সুনানে নাসাই ১ম খণ্ড পৃ.-৬৫-৬৬)

 🟩হাদীস ৩: “নবী ﷺ-এর সেবায় স্নেহ ও ভালোবাসা: যয়নব (রাঃ)-এর স্বর্ণ চিরুনীর বর্ণনা”

عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّهُ كَانَ لَهَا مِخْضَبٌ مِنْ صُفْرٍ، قَالَتْ: كُنْتُ أُرَجِّلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ

অর্থ: যয়নব বিনত জাহাশ (রা) হতে বর্ণিত। তাঁর হলুদ রঙের একটি চিরুনী ছিল যা দ্বারা তিনি রাসূল (সা:)-এর মাথা চিরুনী করে দিতেন। (সুনান ইবনে মাজাহ)

 🟩 হাদিস ৪: “নারী শোক পালন ও ইদ্দতের বিধান: যয়নব (রাঃ)-এর অভিজ্ঞতা ও নবী ﷺ-এর বাণী”

عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ أَبِي سَلَمَةَ، أَنَّهَا دَخَلَتْ عَلَى زَيْنَبَ بِنْتِ جَحْشٍ، زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ تُوُفِّيَ أَخُوهَا، فَدَعَتْ بِالطِّيبِ فَمَسَّتْهُ، ثُمَّ قَالَتْ: إِنِّي لَسْتُ بِطِيبٍ، وَلَكِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ، أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا»

অর্থ: যয়নব বিনতে আবূ সালাম (রা) বলেন : তিনি যয়নব বিনত জাহাশের (রা) নিকট আসলে তিনি বললেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয় মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারে।

তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ (তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র), উম্মু হাবীবা বিনতে আবূ সুফিয়ান, যয়নব বিনতে আবু সালামা, কুলছুম বিনতুল মুসতালাক (র) প্রমুখ সাহাবী ও তাবেঈদের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ওফাত : হিজরী ২০ সালে ওমর (রা)-এর শাসন আমলে ৫৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইস্তেকালের সময় শুধু একটি মাত্র গৃহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর স্মৃতি চিহ্ন এ গৃহটি উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আবদুল মালেক ৫০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তাঁর আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে ক্রয় করে মসজিদে নববীর আন্তর্ভুক্ত করেন ।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর কাফনের কাপড় তৈরি করে যান। এ ব্যাপারে তিনি অসিয়ত করেন যে, ‘ওমর আমার জন্য কাপড় পাঠাতে পারে। এমন হলে এক প্রস্থ কাপড় ছদকা করে দেবে।’

তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী রাসূলে করীম (সাঃ) -এর খাটে করে তাঁকে দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ খাটে করে আবূ বকর (রাঃ)-এর লাশও বহন করা হয়। তবে আবূ বকর (রাঃ)-এর পর যাদের লাশ বহন করা হয়, তাদের মধ্যে যয়নব (রাঃ) ছিলেন প্রথম মহিলা।

ওমর (রা)-এর নির্দেশে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসামা ইবনে যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আবু আহমদ ইবনে জাহাশ এবং মুহাম্মদ ইবনে তালহা তাঁর লাশ কবরে নামান। এঁরা সবাই ছিলেন যয়নব (রাঃ)-এর নিকটাত্মীয় ৷

আয়েশা (রা) তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বলেছিলেন, ‘ভাগ্যবতী অনন্য মহিলা বিদায় নিয়েছেন। এতীমরা হয়ে পড়েছে অস্থির ব্যাকুল। তিনি ছিলেন এতীমদের আশ্রয়স্থল।’

ওমর (রা) তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। তাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। আকীল এবং হানাফিয়ার কবরের মধ্যস্থলে তাঁর কবরের অবস্থান। তাঁর দাফন করার দিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। এজন্য ওমর (রা) সেখানে তাঁবু গাড়েন । জানা যায় কবর খননের জন্য জান্নাতুল বাকীতে এটা ছিল প্রথম তাঁবু ।

🌿 আমরা যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) জীবনী থেকে আমরা যা শিখলাম!

🔹 আল্লাহর বিধান সবকিছুর ঊর্ধ্বে – যয়নব (রাঃ)-এর বিয়ে, ইস্তেখারা, ও ঐশী নির্দেশ — সবকিছুই আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর ফয়সলার প্রতি আস্থা রাখতে হয়।

🔹 তাকওয়া ও আত্মত্যাগ একজন নারীর গৌরব – যয়নব (রাঃ)-এর সিয়াম, কিয়াম ও দানশীলতা আমাদের শেখায় যে, ইবাদতের সৌন্দর্যই একজন মুমিনার মর্যাদা।

🔹 সাম্য ও সামাজিক সংস্কারের প্রতীক – রাসূল ﷺ এক ক্রীতদাসের সাথে নিজের আত্মীয়ের বিয়ে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন—ইসলামে কোনো শ্রেণিবিভেদ বা বিভাজন নেই, আছে চরিত্রের মর্যাদা।

🔹 নারীর ইস্তিহাযা ও ইদ্দতের শরঈ বিধান – হাদীসে এসেছে, নবী ﷺ-এর শিক্ষা অনুযায়ী কিভাবে শারীরিক সমস্যায় ইবাদত বজায় রাখা যায় এবং কীভাবে শোক পালন করা হয়।

🔹 আত্মমর্যাদাপূর্ণ সাহাবিয়াতের দৃঢ় অবস্থান – যয়নব (রাঃ) বলেছিলেন, “আমার বিয়ে আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন” — আমাদের শেখায়, নারী আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যেতে পারে দ্বীনের আলোয়।

🔹 সেবা ও ভালোবাসার সৌন্দর্য – তাঁর স্বর্ণ চিরুনির গল্প নবী ﷺ-এর প্রতি ভালবাসা ও বন্ধনে মিশে আছে, যা আদর্শ দাম্পত্য জীবনের উদাহরণ।

🤲 হে আল্লাহ, আমাদের তাকওয়া এবং আত্মত্যাগের পথে যয়নব (রাঃ)-এর মতো বান্দা বানাও।

📘 যয়নব (রাঃ) সম্পর্কে পাঠকের প্রশ্ন ও ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি!

🔹 রাসূল ﷺ-এর সঙ্গে যয়নব (রাঃ)-এর বিবাহের পেছনে কী ছিল ঐশী বার্তা?

এই বিবাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল—যেন পালকপুত্রের স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের বৈধতা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত হয়। সূরা আহযাব ৩৩:৩৭ এ এর পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে।

🔹 আয়েশা (রাঃ) কেন বলেছিলেন, “আমি দ্বীনের ব্যাপারে যয়নব (রাঃ)-এর চেয়ে উত্তম কাউকে দেখিনি”?

কারণ যয়নব (রাঃ) ছিলেন অতিব পরহেযগার, অধিক রোযাদার ও রাতে নামাজ আদায়কারী। তাঁর তাকওয়া সাহাবীগণের প্রশংসায় প্রমাণিত।

🔹 ইস্তিহাযা অবস্থায় নারীরা কীভাবে ইবাদত করবে—যয়নব (রাঃ)-এর অভিজ্ঞতা কী বলছে?

নবী ﷺ তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ে গোসল ও সালাতের নির্দেশনা দেন। এটি নারীদের স্বাস্থ্যজনিত অবস্থায় ইবাদতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাস্বরূপ।

🔹 যয়নব (রাঃ)-এর দানশীলতার একটি অনন্য ঘটনা কী?

নবী ﷺ বলেছেন, “আমার সঙ্গে যে সবার আগে মিলিত হবে সে অধিক দানশীল।” যয়নব (রাঃ)-এর মৃত্যু নবীজীর পরপরই ঘটে—এটি তাঁর দানশীলতার প্রমাণ।

🔹 তিনি রাসূল ﷺ-এর মাথায় চুল আঁচড়াতেন—তার কি আলাদা গুরুত্ব আছে?

এটি শুধু দাম্পত্য স্নেহ নয়, বরং নবী ﷺ-এর সেবা ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর স্বর্ণ চিরুনির ব্যবহার সিরাহে উল্লেখিত।

🔹 নারীর জন্য ইদ্দত কতদিন? নবী ﷺ কী বলেছেন?

সাধারণ মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের শোক পালন করা যায়। তবে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে—এটি যয়নব (রাঃ)-এর জীবনে প্রতিফলিত।

📚 উম্মুল মু’মিনীন সিরিজের আগের পর্বসমূহ

📊 আপনার মতামত দিন!

যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ)-এর কোন গুণটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?





💬 আপনার ভোট পেইজটির উন্নয়নে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ!

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading