উম্মু হাবীবা (রাযি) ছিলেন রাসূল ﷺ–এর স্ত্রী ও একজন প্রজ্ঞাবান সাহাবিয়্যা। এই লেখায় তাঁর জীবনী, হাদীস, ইদ্দত, যিকির ও সালাত–সংক্রান্ত ইসলামী শিক্ষার আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে।

একদা আবূ সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মে হাবীবা (রাযি) তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবূ সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, ‘তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?” উম্মে হাবীবা বললেন, ‘একজন মুশরিক রাসূল (সা:) এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।’
উন্মুল মু’মিনীন উম্মু হাবীবা (রাঃ)-এর জীবনী!
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন উম্মু হাবীবা (রা)-কে বিয়ে করেন তখন নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল হয়-
عَسَى اللهُ أنْ يُجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُمْ مَوَدَّةٌ .
অর্থ : যারা তোমাদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। (সূরা-৬০ মুমতাহিনা : আয়াত-৭)
🕌 আলোচনার সারাংশ
- উম্মু হাবীবা (রাযি)–র নাম, বংশ, এবং পূর্ব পরিচয়
- আবিসিনিয়ায় হিজরত ও তাঁর ঈমানের দৃঢ়তা
- রাসূল ﷺ–এর সঙ্গে বিবাহ এবং এর দাওয়াহ ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
- তাঁর বর্ণিত সহীহ হাদীসসমূহ: ইদ্দত, নামায, যিকির, মিসওয়াক
- মু’আবিয়া (রাযি)–র সঙ্গে পারিবারিক সংযোগ ও হাদীসের প্রশ্নোত্তর
- ইসলামে নারীর মর্যাদা ও ইবাদতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা
এই জীবনী শুধু একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়—বরং তা ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ, এবং ইবাদতের সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি।
নাম ও পরিচয় : তাঁর আসল নাম রামলা। কারো কারো মতে “হিন্দ’। ডাক নাম উম্মু হাবীবা। পিতার নাম আবূ সুফিয়ান। মাতার নাম সুফিয়া বিনতে আবুল আস। তিনি ওসমান (রা)-এর ফুফু ছিলেন। অর্থাৎ ওসমান (রা) ছিলেন উম্মু হাবীবা (রা)-এর আপন ফুফাতো ভাই । উম্মু হাবীবাহ নবুওয়্যাতের ১৭ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন ৷
বংশ : তাঁর বংশ তালিকা হল, রামলা বিনতে আবূ সুফিয়ান সখর ইবনে হারব ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস। পিতা-মাতা উভয়েই কুরাইশ বংশের লোক ছিলেন। পিতা আবূ সুফিয়ান তো ছিলেন ইসলামের প্রধান শত্রু এবং বিখ্যাত কুরাইশ নেতা ৷
🟢 প্রথম বিবাহ
তিনি মক্কার শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের অন্যতম ছিলেন। যে কারণে পিতা আবূ সুফিয়ান গর্ব করে বলতেন, ‘আমার নিকট রয়েছে সারা আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী লাবণ্যময়ী নারী (উম্মু হাবীবা)।’ আবূ সুফিয়ান তাই অনেক দেখাশোনা, খোঁজ খবরের পর বনু আসাদ গোত্রের সুদর্শন পুরুষ ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশের সাথে উম্মু হাবীবার বিয়ে দেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি উম্মুল মু’মিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা)-এর ভাই ছিলেন।
🟢 ইসলাম গ্রহণ
নবুওয়্যাতের প্রথম যুগেই উম্মু হাবীবাহ ও স্বামী ওবায়দুল্লাহ ইসলাম কবুল করেন। মক্কায় কাফেরদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে হাবশায় হিজরত করেন। এই হাবশাতেই তাঁদের কন্যা হাবীবা জন্মগ্রহণ করেন। এ হাবীবার নামেই তাঁকে উম্মু হাবীবা বলা হয় এবং এ নামেই তিনি পরিচিত হয়ে আছেন।
🟢 প্রথম স্বামীর মৃত্যুবরণ
হাবশাতে আসার পর স্বামী ওবায়দুল্লাহর ভেতর ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলাম গ্রহণের আগে ওবায়দুল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড মদ্যপায়ী। মদ নিষিদ্ধ হলে অন্যান্যদের মত তিনি তা ত্যাগ করেন। কিন্তু হাবশা আসার পর ওবায়দুল্লাহ আবার মদ পান শুরু করেন। উম্মু হাবীবা স্ত্রী হিসেবে তাকে এ পথ থেকে ফেরানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এক রাতে উম্মু হাবীবা তাঁর স্বামীকে বিভৎস অবস্থায় স্বপ্নে দেখেন।
এরপর তিনি স্বামীকে ভয় দেখিয়ে সাবধান করার চেষ্টা করেন কিন্তু উল্টো ওবায়দুল্লাহ তাঁকে বলেন, ‘উম্মু হাবীবা, ধর্মের ব্যাপারে চিন্তা করে বুঝলাম, খ্রিস্টবাদের চেয়ে উত্তম কোনো ধর্ম নেই। আমি ইতোপূর্বে মুসলমান হলেও এখন পুনরায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছি।’ এরপর উম্মু হাবীবা তাকে তিরস্কার করলেন কিন্তু কিছুই হলো না, সে খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং একদিন মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করার কারণে মৃত্যুবরণ করে।
🟢 নি:স্ব উম্মু হাবীবা
ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুর পর থেকে উম্মু হাবীবা সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যান এবং মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন। এ সংবাদ রাসূল (সা:)-এর নিকট পৌছলে, ইসলামের জন্য উম্মু হাবীবার ত্যাগের কথা চিন্তা করে তিনি খুবই বিচলিত হন।
🟢 রাসূল (সা:) এর প্রস্তাব
পরে সব দিক বিবেচনা করে বিয়ের প্রস্তাবসহ আমর ইবনে উমাইয়া যাসিরীকে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে পাঠান। বাদশাহ নাজ্জাশী নিজের দাসী আবরাহার মাধ্যমে এ প্রস্তাব উম্মু হাবীবার নিকট পৌঁছান।
প্রস্তাব পেয়ে উম্মু হাবীবা এতই খুশি হন যে, তিনি আবরাহাকে দু’টি রূপার চুড়ি, পায়ের দু’টি মল এবং দু’টি রূপার আংটি উপহার দেন। উম্মু হাবীবা নিজের পক্ষ থেকে খালিদ ইবনে সাঈদকে উকিল নিয়োগ করেন।
🟢 বিবাহসম্পন্ন
বাদশাহ নাজ্জাশী সন্ধ্যায় স্থানীয় সকল মুসলমান এবং জাফর ইবনে আবূ তালিবকে ডেকে বিবাহ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। বাদশাহর পক্ষ থেকে মোহরানা হিসেবে ৪০০ দেরহাম বা দীনার আদায় করা হয়। উল্লেখ্য যে, এরপর বাদশাহ নাজ্জাশী নিজেই বিয়ে পড়ান। এই বিয়েতে কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
হিজরী ৬ অথবা ৭ সালে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিয়ের সময় উম্মু হাবীবা (রা)-এর বয়স হয়েছিল ৩৬/৩৭ বছর। বিয়ের পর উম্মু হাবীবা জাহাজ যোগে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। জাহাজ যখন মদীনায় পৌছে তখন রাসূল (সা:) খায়বার অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন এবং সেখানে অবস্থান করছিলেন।
রাসূল (সাঃ) কেনো উম্মু হাবীবা (রাযি) কে বিয়ে করেছিলেন?
রাসূল (সা:) উম্মু হাবীবাকে মূলত দু’টো কারণে বিয়ে করেছিলেন:
প্রথমত, স্বামীর মৃত্যু হওয়ার পর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে উম্মু হাবীবা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করছিলেন। তার কষ্ট ছিল ইসলামের প্রতি মহব্বতের কারণে। তিনি স্বামীর মতোই পুনরায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং স্বামীর এ ধরনের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এ ত্যাগের পুরস্কার হিসেবে রাসূল তাঁকে বিয়ে করেন।
দ্বিতীয়ত, আবূ সুফিয়ান ছিলেন সে কুরাইশ নেতা যিনি আবূ জেহেলের মৃত্যুর পর ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। নবুওয়্যাতের সে প্রথম দিন থেকেই আবূ সুফিয়ান রাসূল (সা:) ও মুসলমানদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও জুলুমের বন্যা প্রবাহিত করেছে। বলা যায়, মানুষের পক্ষে যত প্রকার পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব আবূ সুফিয়ান তার কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ছাড়েনি।
বিয়ের ফলাফল : ইসলাম ও মুসলমানদের এ জাত শত্রুরই কন্যা ছিলেন উম্মু হাবীবা (রা)। এ জন্য রাসূল (সা:) রাজনৈতিক কারণে সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা করেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ে করেন। ঐতিহাসিক ফলও পাওয়া যায়। আবৃ সুফিয়ান ক্রমে নরম হতে থাকেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম কবুল করেন।
তাঁর ঈমানের বলিষ্ঠতা : উম্মু হাবীবার চরিত্র মাধুর্যে উম্মু হাবীবা (রা) ছিলেন নেককার ও বলিষ্ঠ ঈমানের অধিকারিণী। তিনি ঈমান ও ইসলামের ব্যাপারে কারো সাথে সমঝোতা করতে বা সামান্য দুর্বলতা দেখাতেও রাজি ছিলেন না। এর প্রমাণ তো আমরা তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ যখন পুনরায় খ্রিস্টান হন তখনই পেয়েছি।
অন্যদিকে তাঁর পিতা আবূ সুফিয়ান একবার মদীনায় আসেন হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়সীমা বাড়ানোর জন্য। তিনি ইচ্ছে পোষণ করছিলেন যে, তাঁর কন্যা উম্মু হাবীবাকে দিয়েই রাসূল (সা:)-এর কাছে আবেদন পেশ করবেন, যাতে সহজেই তা পাস হয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি উম্মু হাবীবার গৃহে পদার্পণ করেন।
একদা আবূ সুফিয়ান যখন মেয়ের গৃহে প্রবেশ করে বিছানায় বসতে যান তখন উম্মু হাবীবা তা উল্টে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আবূ সুফিয়ান খুব অপমানবোধ করেন এবং বলেন, ‘তুমি এ বিছানায় নিজের পিতাকেও বসতে দিবে না?’ উম্মু হাবীবা বললেন, ‘একজন মুশরিক রাসূল (সা:) এর বিছানায় বসুক অবশ্যই আমি তা পছন্দ করি না।’ কন্যার কথা শুনে আবূ সুফিয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি আমার বিরুদ্ধে খুব বেশি বিগড়ে গেছ।’
উম্মু হাবীবা (রাযি) নিজের পিতার সাথে যে রূঢ় আচরণ করেছিলেন তা শুধুমাত্র ঈমানের তাকিদে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। তিনি ছোট খাট ব্যাপারেও খুব গুরুত্ব দিতেন এবং অন্যদেরকেও সে ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন ও তাকিদ দিতেন। একবার তাঁর ভাগিনা আবূ সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ছাতু খেয়ে কুলি না করলে তিনি বললেন, ‘তোমার কুলি করা উচিৎ ছিল। কারণ, নবীজী বলেছেন, আগুনে পাকানো জিনিস খেলে অযূ করতে হয়। একবার তিনি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, প্রতিদিন যে ১২ রাকা’আত করে নফল সালাত পড়লে জান্নাতে তার জন্য ঘর তৈরি করা হবে। এরপর থেকে তিনি আর এ সালাত ছাড়েননি। তিনি নিজেই বলেছেন, অত:পর আমি নিয়মিত বার রাকা’আত সালাত পড়তাম।
তাঁর পিতা আবূ সুফিয়ান ইন্তেকাল করলে তিনদিন পর তিনি খোশবু চেয়ে নিয়ে হাতে মুখে মাখেন এবং বলেন, ঈমানদার নারীর জন্য তিনদিনের বেশি শোক করা জায়েয নেই, অবশ্য স্বামী ছাড়া। স্বামীর জন্য স্ত্রীর শোক করার মেয়াদ হচ্ছে চার মাস দশ দিন। নবীজীকে একথা বলতে না শুনলে এ ব্যাপারে আমার কোনো খবরই ছিল না।’
প্রথম স্বামী ওবায়দুল্লাহর ঔরসে তাঁর দু’জন সন্তান আবদুল্লাহ ও হাবীবার জন্ম হয়। যতদূর জানা যায় তার আর কোনো সন্তান হয়নি।
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে উম্মু হাবীবা (রাযি)-এর অবদান!
উম্মুল মু’মিনীন উম্মু হাবীবা (রাযি) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও যয়নব বিনতে জাহাশ (রা) থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে তা বর্ণনা করেন। তাঁর থেকে ৬৫টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি মুত্তাফাকুন আলাইহি এবং দু’টি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
ইবনে উতবা, সালেম ইবনে সেওয়ার হাবীবা, মু’আবিয়া ওবা, আবূ সুফিয়ান, আবদুল্লাহ বিন ওত্বা, সালিম বিন সাওয়াব, আবূল জিরাহ, যয়নব বিনতে আবু সালামা, সুফিয়া বিনতে সায়বা, ওরওয়া বিন যুবায়ের, শাহার বিন হাওশাব, আবূ সালেহ আস সামান প্রমুখ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস পূনরুক্তিসহ সহীহ আল-বুখারীতে ৮টি, সহীহ মুসলিমে ৯টি, জামে’ আত তিরমিযীতে ৪টি, সুনান আবু দাউদে ৮টি, নাসাঈতে ৩৪টি এবং ইবনে মাজায় ৮টি সংকলিত হয়েছে। তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের কয়েকটি প্রামাণ্য হাদীস গ্রন্থ হতে নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
হাদীস ১: ইদ্দত ও শোক পালন
Arabic:
عَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ بِنْتِ أَبِي سُفْيَانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ:
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ:
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
বাংলা অনুবাদ: উম্মু হাবীবা বিনতে আবূ সুফিয়ান (রাযি) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন : যখন তাঁর পিতার মৃত্যু সংবাদ তাঁর কাছে আসলো, তিনি সুগন্ধি আনতে বললেন। অতঃপর তা স্বীয় বাজুতে মাখলেন এবং বললেন : আমার কোন সুগন্ধির প্রয়োজন হতো না, যদি না আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে বলতে শুনতাম, তিনি বলেছেন, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন নারীর জন্য বৈধ নয় কোন মৃতের জন্য তিন দিনের অধিক শোক প্রকাশ করা। তবে স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশ দিন শোক প্রকাশ করা যায়।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম ১৪৮, বুখারী ২য় খণ্ড, পৃ. ৮০৪-৮০৫।
হাদীস ২: বারো রাকাআত নামায ও জান্নাত
Arabic:
عَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ (رضى الله عنها) تَقُولُ:
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ:
مَنْ صَلَّى إِثْنَى عَشَرَةَ رَكْعَةً فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ بُنِيَ لَهُ بَيْتٌ فِي الْجَنَّةِ
قَالَتْ أُمُّ حَبِيبَةَ: فَمَا تَرَكْتُهُنَّ مُنْذُ سَمِعْتُهُنَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ
বাংলা অনুবাদ: উম্মু হাবীবা (রাযি) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে বলতে শুনেছি— “যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে বারো রাকাআত নামায আদায় করে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করা হয়।” তিনি বলেন: “এই হাদীস শুনার পর থেকে আমি কখনো এই নামায ত্যাগ করিনি।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৮।
হাদীস ৩: কাপড় ও সালাত
Arabic:
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ أَنَّهُ سَأَلَ أُخْتَهُ أُمَّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ:
هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُصَلِّي فِي الثَّوْبِ الَّذِي يُجَامِعُهَا فِيهِ؟
فَقَالَتْ: نَعَمْ، إِذَا لَمْ يَرَ فِيهِ أَذًى
বাংলা অনুবাদ: মু’আবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রাযি) তাঁর বোন উম্মু হাবীবা (রাযি) কে জিজ্ঞেস করলেন: “নবী ﷺ কি সেই কাপড়েই সালাত আদায় করতেন, যেটিতে তিনি স্ত্রী সহবাস করতেন?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ, যদি তাতে কোনো নাপাকীর চিহ্ন না দেখা যেত।”
সূত্র: আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩
হাদীস ৪: মানুষের কথাবার্তা ও যিকির
Arabic:
عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ عَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ:
كُلُّ كَلَامِ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ إِلَّا أَمْرًا بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهْيًا عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ ذِكْرَ اللَّهِ
বাংলা অনুবাদ: সাফিয়্যা বিনতে শায়বা (রা) উম্মু হাবীবা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী বলেছেন : বনু আদমের প্রতিটি কথাই তার বিপক্ষে যাবে তবে সৎকাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ এবং যিকরুল্লাহ বা আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত।”
সূত্র: (মুসলিম)।
হাদীস ৫: সালাতের আগে মিসওয়াক
Arabic:
عَنْ أُمِّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّهَا قَالَتْ:
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ:
لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ
বাংলা অনুবাদ: উম্মু হাবীবা (রাযি) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে বলতে শুনেছি— “যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদেরকে প্রতি সালাতের আগে মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম।”
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫৮৯।
ওফাত : আপন ভাই আমীর মু’আবিয়ার শাসন আমলে হিজরী ৪৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে উম্মু হাবীবা (রা) ইন্তেকাল করেন। মদীনায় তাঁকে দাফন করা হয় । অন্য এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাঁকে আলী (রা)-এর গৃহে দাফন করা হয়। এর প্রমাণ হলো জয়নুল আবেদীন (রা) তার গৃহ খননকালে একটি শিলা লিপি পান, তাতে লেখা ছিল, এটা রামলা বিনতে সাখর-এর কবর।
মৃত্যুর আগে তিনি আয়েশাকে (রা) ডেকে বলেন, ‘আমার এবং আপনার মধ্যে সতীনের মতো সম্পর্ক ছিল। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে মাফ করে দেবেন এবং আমার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করবেন। আয়েশা দোয়া করলে তিনি পুনরায় বললেন, আপনি আমাকে খুশি করেছেন, আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন।
📘 সিরিজে যুক্ত থাকুন
উম্মুল মু’মিনীন সিরিজে আমরা তুলে ধরছি রাসূল ﷺ–এর স্ত্রীদের জীবনী, তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, এবং ইসলামী শিক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত। আপনি যদি ইসলামে নারীর ভূমিকা, সাহাবিয়াদের জীবন, এবং সহীহ হাদীসের আলোকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী হন—তাহলে এই সিরিজ আপনার জন্যই।