উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা) এর জীবনী

উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রাযি) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর ঘরের একজন সম্মানিত নারী, যাঁর জীবনের গল্প ইসলামি ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তিনি ছিলেন কিবত জাতির প্রতিনিধি, যাঁর মাধ্যমে নবীজি ﷺ–এর পুত্র ইব্রাহীম (রাযি)–এর জন্ম হয়। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—বিশেষ করে ইব্রাহীম (রাযি)–এর জন্ম ও অশ্রুভেজা বিদায়—উম্মাহর হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী!

হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হওয়ার পর রাসূল (সা:) পার্শ্ববর্তী রাষ্টগুলোতে রাষ্ট প্রধানদের নিকট দূত মারফত ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করেন। এ চিঠির প্রেক্ষিতে মিসরের খ্রিস্টান শাসক মুকাওকিস সৌহার্দ্র ও শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ আপন চাচাত বোন মরিয়ম বা মারিয়া কিবতিয়াকে রাষ্ট্রীয় পর্যাপ্ত উপঢৌকনসহ তৎকালীন প্রথানুসারে মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান রাসূল-এর দরবারে উপহারস্বরূপ প্রেরণ করেন।

মারিয়া কিবতিয়া
মারিয়া আল কিবতিয়া (রাঃ) এর ক্যালিগ্রাফী।

অপর এক বর্ণনামতে উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরিত মহিলার সংখ্যা ছিল চারজন। ইবনে কাছীরের বর্ণনামতে সম্ভবত অপর দুই মহিলা এ ভগ্নীদ্বয়ের খাদিমা (দাসী)-স্বরূপ ছিলেন। এ উপঢৌকনের সাথে মাবূর নামক একজন খোজা দাস (তিনি ছিলেন মারিয়ার ভ্রাতা) এবং দুলদুল নামক সাদা রংয়ের একটি খচ্চরও প্রেরিত হয়েছিল। আরও ছিল এক হাজার মিছকালে স্বর্ণ ও (বিশটি) রেশমী কাপড়, এগুলো প্রেরণ করা হয় রাসূল (সাঃ) এর দূত হাতিব ইবনে আবী বালতা আর মাধ্যমে। হাতিব (রা) তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে মারিয়া ভগ্নীদ্বয় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মাবূর পরে মদীনায় রাসূল (সাঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসূল (সাঃ) আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে এ উপহার ও উপঢৌকন গ্রহণ করেন। এ সকল উপঢৌকন পাওয়ার পর সর্বপ্রথম রাসূল (সাঃ) মারিয়ার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। মারিয়া আনন্দের সাথে এ দাওয়াত কবুল করেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর মারিয়ার সম্মতিতে সম্পূর্ণ ইসলামী বিধান মোতাবেক রাসূল (সা:) তাঁকে বিয়ে করেন। এভাবে মিসরের রাষ্ট্র প্রধান মুকাওকিসের উপহারের সঠিক মূল্যায়ন করেন। 

অন্য বর্ণনা মতে, রাসূল (সা:) মারিয়াকে নিজের দাসী হিসেবে রাখেন এবং সীরীনকে হাসসান ইবনে ছাবিত (রা)-কে প্রদান করেন। তাঁর গর্ভে ‘আবদু’র রাহমান ইবন হাসসান জন্মগ্রহণ করেন।

সপ্তম হিজরী সালের শেষের দিকে এ বিয়ে সংঘটিত হয়। এরপর রাসূল (সা:) আর কোন বিয়ে করেননি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকেও রাসূল (সা:)- এর জন্য নতুন কোনো বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়। আল্লাহ বলেন-

لَا يَحِلُّ لَكَ النِّسَاءُ مِنْ بَعْدُ وَلَا أَنْ تَبَدَّلَ بِهِنَّ مِنْ أَزْوَاجٍ وَلَوْ أَعْجَبَكَ حُسْنُهُنَّ إِلَّا مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ رَقِيبًا

বাংলা অনুবাদ: এরপর আর কোনো নারী আপনার জন্য হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয়—যদিও তাদের সৌন্দর্য আপনাকে আকর্ষিত করে। তবে যেসব নারী আপনার অধিকারভুক্ত (দাসী), তারা ব্যতিক্রম। আল্লাহ সব কিছুর উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।

সূত্র: সূরা আহযাব, আয়াত ৫২। 

অন্য বর্ণনা মতে, মারিয়া হলেন রাসূল (সা:)-এর বান্দী ও তাঁর পিতা হলেন শামউন। সমস্ত বান্দীদের মধ্যে রাসূল (সা:) তাকেই পর্দা করার নির্দেশ প্রদান করেন।

নবীজির ﷺ ঘরে এক শিশুর আগমন: ইব্রাহীম (রাযি)–এর জন্ম!

মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্মগ্রহণ করে রাসূল (সাঃ)-এর অন্যতম পুত্র সন্তান ইব্রাহীম। আওয়ালী নামক স্থানে হিজরী ৮ম সালে তাঁর জন্ম হয়। এখানেই মারিয়া (রাঃ) বাস করতেন। এখানে ইব্রাহীমের জন্ম হওয়ার কারণে স্থানটি ‘মাশরাবাই ইব্রাহীম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ইব্রাহীমের জন্মকালে ধাত্রী নিযুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী আবূ রাফের পত্নী বিবি সালমা। তিনি যখন রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে পুত্র সন্তান হওয়ার শুভ সংবাদটি দেন তখন রাসূল (সাঃ) খুশি হয়ে তাকে একজন গোলাম দান করেন।

ইব্রাহীমের জন্মের সংবাদে রাসূল (সাঃ) খুব খুশি হন। সাতদিনের দিন তাঁর আকীকা দেয়া হয় এবং মাথা মুড়িয়ে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা গরীবদের মাঝে দান করে দেন। এ দিনেই মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আঃ)-এর নামে তাঁর নামকরণ করা হয় ইব্রাহীম।

সদ্য প্রসূত শিশু ইব্রাহীমকে দুধ পান করানোর জন্য অনেক আনসার মহিলা প্রার্থী হন। শেষে খাওলা বিনতু যায়দুল আনসারীকে দাই নিযুক্ত করেন। এ জন্য রাসূল (সাঃ) তাকে কয়েকটি ফলবান খেজুর গাছ দান করেন।

খাওলা বিনতে যায়দুল উম্মু রাফে নামেও পরিচিত ছিলেন । তিনি তাঁর স্বামী বারা বিন আউদু’র সাথে মদীনার উপকন্ঠে বাস করতেন। বারা পেশায় ছিলেন কর্মকার। এ জন্য তার বাড়ি প্রায়ই ধোয়ায় আচ্ছন্ন থাকত। তবুও রাসূল (সাঃ) সন্তানের টানে প্রায়শ সেখানে যেতেন এবং ইব্রাহীমের খোঁজ খবর নিতেন।

🕊️ অশ্রুভেজা বিদায়: ইব্রাহীম (রাযি)–এর ইন্তেকাল ও সূর্যগ্রহণ!

সতের বা আঠার মাস বয়সের সময়ে ইব্রাহীম ধাত্রী মাতা খাওলার গৃহেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রাসূল (সাঃ) সাহাবী আবদুর রহমানসহ সেখানে ছুটে যান । হাত বাড়িয়ে মৃত ইব্রাহীমকে কোলে তুলে নেন। আর তখনি রাসূল (সা:)-এর দু’চোখ দিয়ে বাধ ভাঙা জোয়ারের মতো পানি নেমে আসে। আবদুর রহমান আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা:) আপনার অবস্থা এমন কেন? রাসূল (সা:) বলেন, ‘আজ আমার অপত্য স্নেহ অশ্রু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়ছে।’

“চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত, অন্তর ব্যথিত, কিন্তু মুখে এমন কথা বলতে পারি না যা আল্লাহ তা’আলা অপছন্দ করেন। হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত।”
— রাসূলুল্লাহ ﷺ

রাসূল (সা:) তাঁর প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যুতে ভীষণ মর্মাহত হন। তাঁর চক্ষু হতে অশ্রু প্রবাহিত হয়। এ অবস্থায় তিনি বললেন : চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত, অন্তর ব্যথিত, কিন্তু মুখে এমন কথা বলতে পারি না যা আল্লাহ তা’আলা অপছন্দ করেন। হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত। আল্লাহর নির্দেশমত আমরা إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ পড়ছি। ফাদল ইবনে ‘আব্বাস (রা) বা উম্মু বুরদা (রা) তাঁকে গোসল দেন। ছোট খাটিয়ায় করে জানাযা বহন করা হয়।

ইব্রাহীমের মৃত্যুর দিন ঘটনাক্রমে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। সকলে বলাবলি করতে লাগল যে, রাসূল (সা:)-এর পুত্র মারা গেছে বলেই আজ সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তারা বলতে লাগল, ‘আকাশ শোকাভিভূত হয়ে পড়েছে, সে জন্যই দুনিয়ায় বিদঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে।’ কিন্তু বিশ্ব সংস্কারক রাসূল (সা:) যখন এ সংবাদ শুনলেন তখনই তিনি এ কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করার জন্য সকলকে ডেকে বললেন, ‘সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণ হচ্ছে আল্লাহ্ নিদর্শন। কারো জীবন ও মরণের সঙ্গে এগুলোর কোনোই যোগাযোগ নেই। সুতরাং গ্রহণ লাগা বা না লাগার পেছনে কারো মৃত্যুর কোনো সম্বন্ধ নেই।’

ইব্রাহীমের লাশ ছোট একটা খাটে করে আনা হয়। রাসূল (সাঃ) নিজে পুত্রের জানাযা পড়ান। তারপর তাঁকে বিশিষ্ট সাহাবী উসমান বিন মাযউনের কবরের পাশে দাফন করা হয়। তাঁর লাশ কবরে নামান উসামা ও ফযল বিন আব্বাস । রাসূল (সাঃ) দাফন শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে কবরের ওপর সামান্য পানি ছিটিয়ে দেয়া হয় এবং নির্দিষ্ট চিহ্ন দিয়ে কবরটিকে চিহ্নিত করা হয়।

আরও জানুন: নবীজির ছেলে ও মেয়েদের নাম অর্থসহ!

খোলাফায়ে রাশেদার প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা আবূ বকর ও ওমর (রা) মারিয়া (রা)-কে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। রাসূল (সা:)-এর ইন্তেকালের পর উভয় খলিফাই তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমন কি মারিয়া কিবতিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর আত্মীয়-স্বজনকেও উক্ত দু’জন খলিফা সম্ভাব্য সকল সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।

ওফাত : ইব্রাহীম (রা)-এর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর মারিয়া কিবতিয়া ইন্তেকাল করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।

উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রা) সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর!

🟩 সূর্যগ্রহণ ও নবীজির ﷺ বক্তব্য

ইব্রাহীম (রাযি)–এর ইন্তেকালের দিন সূর্যগ্রহণ ঘটে। অনেকে ভাবেন এটি তাঁর মৃত্যুর কারণে। রাসূল ﷺ বলেন: “সূর্য ও চন্দ্র কারো মৃত্যুর কারণে গ্রহণ করে না। এটি আল্লাহর নিদর্শন।”

শিক্ষা: ইসলামে কুসংস্কার ভাঙা ও তাওহীদের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

🟩 মারিয়া কিবতিয়া (রাযি:)- স্ত্রী না দাসী?

ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে—কিছু সূত্রে বলা হয়, রাসূল ﷺ তাঁকে দাসী হিসেবে রেখেছিলেন, আবার কিছু সূত্রে বলা হয়, তিনি তাঁকে বিবাহ করেছিলেন। ইবনু সা’দ, ইবনু হিব্বান, এবং আল-তাবারী–এর মতভেদ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

🟩মারিয়া কিবতিয়া (রাযি)–এর থেকে কোনো হাদীস বর্ণিত হয়েছে কি?

না, তাঁর থেকে সরাসরি কোনো হাদীস পাওয়া যায়নি।

🟩তিনি রাসূল ﷺ–এর স্ত্রী ছিলেন কি?

কিছু সূত্রে বলা হয় তিনি দাসী ছিলেন, আবার কিছু সূত্রে বলা হয় রাসূল ﷺ তাঁকে বিবাহ করেছিলেন।

🟩ইব্রাহীম (রাযি)–এর বয়স কত ছিল?

ইব্রাহীম (রাযি) মাত্র ১৬–১৮ মাস বয়সে ইন্তেকাল করেন।

🗣️ আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

উম্মুল মু’মিনীন মারিয়া কিবতিয়া (রাযি)–এর জীবনী আপনাকে কেমন অনুভব করিয়েছে? তাঁর জীবনের এই অধ্যায় কি আপনার হৃদয় ছুঁয়েছে? নিচে মন্তব্য করে জানাতে পারেন আপনার ভাবনা, অনুভূতি, কিংবা কোনো পরামর্শ—আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করব।

📩 মন্তব্য করতে নিচের ফর্ম ব্যবহার করুন অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

✍️ আপনার মতামত দিন

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading