Site icon Amar Bangla Post

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি: উপহার, যৌতুক ও রান্নাঘরের রাজনীতি

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি, উপহারের প্রত্যাশা ও পারিবারিক চাপে একজন নারীর মানসিক কষ্টের প্রতীকী চিত্র।

উপহারের পরিমাণ দিয়ে একজন নারীর সম্মান ও মর্যাদা বিচার করা যায় না।

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি ও বিয়ের নানা আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপহার, পিঠা-পুলি ও পারিবারিক প্রত্যাশা। কিন্তু এসব প্রথার আড়ালে কখনো কখনো একজন নারীর জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। পড়ুন চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি ও রান্নাঘরের রাজনীতি নিয়ে আমার আর্টিকেল। 

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি: উপহার, যৌতুক ও নারীর ওপর মানসিক নির্যাতনের বাস্তবতা

চট্টগ্রামের পটিয়ায় মাত্র ২২ বছর বয়সী এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু আমাদের সমাজের সামনে আবারও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো নাশতার পরিমাণ কম হয়েছে—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে মারধরের শিকার হন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিফাতুন নূর। টানা নয় দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তাঁর মৃত্যু হয়।[১]

সিফাতুনের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর শাশুড়ি ও দুই ননদ তাঁকে মারধর করেছিলেন।[৩] পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ৪৫০টি পিঠা, ৪০টি পেয়ারা, মাছ, আপেল, ড্রাগন ফল ও দুধসহ বিভিন্ন খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। এত কিছু নেওয়ার পরও নাশতা কম হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।[২] বিষয়টি নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

একটি পরিবারের জন্য পাঠানো পিঠা, ফল কিংবা খাবারের পরিমাণ কীভাবে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর জীবনে এমন ভয়াবহ পরিণতির উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে? আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার নামে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি কখন মানুষের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে?

সিফাতুনের মৃত্যু আমাদের শুধু একটি পরিবারের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—বিয়ের পর একজন নারী কি সত্যিই নতুন একটি পরিবার পান, নাকি তাঁকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু সামাজিক প্রত্যাশা, দাবি ও অলিখিত নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়?

আরও পড়ুন: হায়রে টাকার সংসার! দুঃখিনী মুন্নি জীবনের গল্প

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি: উপহারের নামে প্রত্যাশার বোঝা

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিয়ে ও বিয়ের পরবর্তী সময়ে কিছু সামাজিক রীতি প্রচলিত রয়েছে। অঞ্চলভেদে এসব রীতির ধরন ও মাত্রায় পার্থক্য থাকলেও কিছু পরিবারের ক্ষেত্রে এগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মেয়ের বাবার বাড়িকে বছরের পর বছর নানা উপহার ও খাবার পাঠানোর চাপ বহন করতে হয়।

বিয়ের সময় মেয়ের পরিবার থেকে আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ নানা উপহার প্রত্যাশা করা হয়। কোথাও ছেলের বাড়ি আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার রীতিও রয়েছে। বিয়ের পরও সেই প্রত্যাশার অবসান ঘটে না।

ফলের মৌসুমে শ্বশুরবাড়ি ও আত্মীয়স্বজনের জন্য ফল পাঠাতে হয়। পিঠার মৌসুমে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মধ্যে বিলানোর জন্য বিপুল পরিমাণ পিঠা তৈরি করে পাঠাতে হয়। ঈদে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের জন্য কাপড়চোপড়, প্রথম কোরবানির ঈদে গরু ও পরের কোরবানির ঈদে গরুর রানের প্রত্যাশাও কিছু পরিবারে দেখা যায়।

এ ছাড়া শ্বশুরবাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে খাবার ও উপহার পাঠানোর অলিখিত নিয়ম রয়েছে। কখনো কখনো এসব প্রত্যাশা এতটাই বেড়ে যায় যে মেয়ের পরিবারকে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করতে হয়।

প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সত্যিই ভালোবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ, নাকি সামাজিক মর্যাদা রক্ষার নামে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের বাধ্যবাধকতা?

উপহার দেওয়া অবশ্যই সুন্দর একটি বিষয়। কিন্তু সেই উপহার যখন প্রত্যাশায় পরিণত হয়, প্রত্যাশা যখন দাবিতে রূপ নেয়, আর দাবি পূরণ না হলে মেয়েকে অপমানিত হতে হয়, তখন সেটিকে আর ভালোবাসার উপহার বলা যায় না।

উপহার কম হলে বউয়ের সম্মানও কি কমে যায়?

একটি মেয়ের বাবার আর্থিক অবস্থা সব সময় স্বামীর পরিবারের মতো হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেউ আর্থিকভাবে সচ্ছল, কেউ মধ্যবিত্ত, আবার কেউ সাধারণ আয়ের মানুষ। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক।

কিন্তু কিছু পরিবারে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে কী এসেছে, কতটুকু এসেছে, অন্য বউদের তুলনায় বেশি না কম এসেছে—এসব বিষয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলে।

কোনো বউয়ের বাবার বাড়ি থেকে বেশি উপহার এলে তাঁকে নিয়ে প্রশংসা করা হয়। অন্যদিকে কারও বাবার বাড়ি থেকে তুলনামূলক কম কিছু এলে তাঁকে কথা শোনানো হয়। কখনো সরাসরি, কখনো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে তাঁর বাবার বাড়ি যথেষ্ট কিছু দিতে পারেনি।

এমনকি কোনো কোনো পরিবারে মুখে কিছু না বললেও আচরণে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। প্রতিনিয়ত অন্যের সঙ্গে তুলনা, ছোট করা এবং বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করা একজন নারীর জন্য গভীর মানসিক যন্ত্রণার কারণ হতে পারে। আর এই মানসিক যন্ত্রণা ভোগের কারণ হচ্ছে শাশুড়ি ও ননদ নামক অতিলোভী প্রাণীরা। আর এর পিছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ি থাকে ছেলে ও ছেলের বাবা। কারণ তারা অন্যায় হতে দেখেও কোনো প্রতিবাদ করে না, প্রতিকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। 

স্বামীর পরিবারের সদস্যদের বিশেষভাবে স্বামীকেই বুঝা উচিৎ যে, একজন নারী বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসেছেন একটি সুখের ও সমৃদ্ধশালী জীবন গড়তে। তিনি কোনো উপহার নিয়ে আসার যন্ত্র নন। তাঁর সম্মান, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করা উচিত তাঁর মানুষ হিসেবে পরিচয়ের ওপর, বাবার বাড়ি থেকে কী নিয়ে এসেছেন বা তার বাবার বাড়ি থেকে কি উপহার এসেছে তার ওপর ভিত্তি করে নয়। 

আসলে আমাদের সবাইকেই বুঝা উচিৎ যে, আমার মেয়ে যেমন আমার কাছে রাজকন্যা, ঠিক তেমনি যে আমার স্ত্রী বা পুত্রবধু হয়ে আমার এই ঘর এই সংসারে এসেছে, সেই মেয়েটিও তার বাবা মায়ের রাজকন্যা ছিলো এবং এখনো আছে। আপনাদের দেওয়া আঘাত তাদেরকেও কষ্ট দেয়, যন্ত্রণা দেয়, মর্মাহত করে। আপনিও কি তার কারণ হতে চান কিংবা কেউ আপনি ও আপনার আদুরে রাজকন্যার সাথে এমনটি ঘটুক তা কি চান? একটু ভাবুন। কারণ আমরা মানুষ, কোনো হিংস্র হায়না নয়।

রান্নাঘরের রাজনীতি: সংসারের ভেতরে অদৃশ্য নির্যাতন

সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারে একটি ঘরোয়া চলে যাকে রান্নাঘরের রাজনীতি বলা যায়।

পারিবারিক জীবনে রান্নাঘর শুধু খাবার তৈরির জায়গা নয়। অনেক সময় এখান থেকেই শুরু হয় তুলনা, অসন্তোষ, দলাদলি এবং মানসিক নির্যাতনের নানা অধ্যায়।

কোন বউয়ের বাবার বাড়ি থেকে কী এসেছে, কে কত ভালো খাবার পাঠিয়েছে, কার শ্বশুরবাড়িতে কত উপহার গেছে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে দেয়।

বিশেষ করে নতুন বউকে ঘিরে শাশুড়ি, ননদ কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। কোথাও তাঁকে নিজের মতো করে চলতে দেওয়া হয় না। কোথাও তাঁর পোশাক, সাজগোজ, রান্নাবান্না, বাবার বাড়িতে যাওয়া কিংবা স্বামীর সঙ্গে কোয়ালিটি সময় কাটানো নিয়েও অযাচিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, সব শাশুড়ি কিংবা ননদ এমন নন। অনেক পরিবারে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দর। আবার অনেক নারী নিজেরাও শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হন। তাই সমস্যাটিকে নারী বনাম নারী হিসেবে দেখলে প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে।

এই ধরনের সামাজিক আচরণ টিকিয়ে রাখার পেছনে পুরুষদের ভূমিকাও রয়েছে। কেউ সরাসরি এসব দাবি করেন, কেউ উৎসাহ দেন, আবার কেউ অন্যায় দেখেও নীরব থাকেন। ফলে সমস্যাটি শুধু রান্নাঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পারিবারিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

প্রবাসী স্বামী ও যৌথ পরিবারের বাস্তবতা

চট্টগ্রামের অনেক পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকেন। জীবিকার প্রয়োজনে স্বামী বছরের পর বছর প্রবাসে কাটান। অন্যদিকে স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক নারীকে একা হাতে সংসারের নানা দায়িত্ব সামলাতে হয়।

স্বামী পাশে না থাকায় নিজের প্রয়োজন, ইচ্ছা কিংবা অসুবিধার কথা বলার মতো মানুষও অনেক সময় পাওয়া যায় না। শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়।

কেউ হয়তো স্বামীর অপেক্ষায় দিন কাটান। স্বামী দেশে ফিরলে তাঁর সঙ্গে একটু ভালো সময় কাটাবেন, নিজের মতো করে সাজবেন, কোথাও ঘুরতে যাবেন—এমন স্বাভাবিক ইচ্ছাও থাকে। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের বাঁকা দৃষ্টি কিংবা নেতিবাচক মন্তব্যের ভয়ে অনেক নারী নিজেদের ইচ্ছাগুলো প্রকাশ করতে পারেন না।

আবার যৌথ পরিবারে একাধিক ভাইয়ের স্ত্রী একই বাড়িতে থাকলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পর্দার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় পরিবারের সঙ্গে থাকা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেখানে প্রত্যেক দম্পতির ব্যক্তিগত জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় সীমারেখার প্রতি সম্মান থাকা প্রয়োজন।

যৌথ পরিবারে থাকতেই হবে, কিংবা স্বামী প্রবাসে থাকলেও স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতেই থাকতে হবে—এমন কোনো সামাজিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করা উচিত নয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও স্বামী-স্ত্রী নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা সংসার গড়ে তুলতে পারেন। এবং ইসলাম সেটাই নির্দেশ করে। 

স্বামীর নীরবতা কি নির্যাতনকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে না?

একজন নারী যখন স্বামীর বাড়িতে অপমানিত হন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে স্বামী অন্তত তাঁর পাশে দাঁড়াবেন।

কিন্তু বাস্তবে অনেক স্বামী পরিবারের অন্য সদস্যদের অসন্তুষ্ট করার ভয়ে স্ত্রীর পক্ষে কথা বলেন না। স্ত্রীকে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, বাবার বাড়ি নিয়ে কটাক্ষ করা হচ্ছে, অযৌক্তিক উপহার চাওয়া হচ্ছে—এসব দেখেও তাঁরা নীরব থাকেন।

কেউ হয়তো মনে করেন, পরিবারের নারীদের মধ্যকার বিষয়ে কথা বললে অশান্তি বাড়বে। কেউ আবার বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান দেখানোর নামে স্ত্রীর প্রতি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যান।

অথচ একজন স্বামীর দায়িত্ব শুধু সংসারের খরচ বহন করা নয়। স্ত্রীর সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার রক্ষাও তাঁর দায়িত্ব।

বাবা-মায়ের সম্মান করতে হবে, তাঁদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু তাঁদের অন্যায় আচরণকে সমর্থন করা কিংবা স্ত্রীর ওপর অন্যায় মেনে নিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

একটি সংসারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই পরস্পরের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

আরও পড়ুন: স্ত্রীর উপর নির্যাতন নয়, সদাচরণ করুণ (উপদেশ)

মানসিক নির্যাতনও নির্যাতন

সব নির্যাতনের চিহ্ন শরীরে দেখা যায় না। কিছু আঘাত মানুষের মনের ভেতরে জমতে থাকে।

প্রতিদিন অপমানিত হওয়া, নিজের বাবার বাড়ি নিয়ে কটাক্ষ শোনা, অন্যের সঙ্গে তুলনা সহ্য করা, নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে না পারা কিংবা স্বামীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়া—এসব অভিজ্ঞতা একজন নারীর মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অনেক নারী সংসারের শান্তির কথা ভেবে সবকিছু নীরবে সহ্য করেন। তাঁরা মনে করেন, প্রতিবাদ করলে সংসার ভেঙে যেতে পারে, স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁকে আরও বেশি অপছন্দ করতে পারেন।

কিন্তু দীর্ঘদিন অন্যায় সহ্য করাই কি সংসার টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়?

একটি সংসার তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে প্রত্যেক সদস্যের মতামত, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারও নীরবতাকে তাঁর কষ্ট না থাকার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামাজিক লোকদেখানো কেন?

আমাদের সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, মেহমানদারি, উপহার দেওয়া এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো সুন্দর কিছু রীতি রয়েছে। এসবের অনেক কিছুই ইসলামের শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন ভালো কাজগুলো লোকদেখানো কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপকরণ হয়ে ওঠে।

আত্মীয়কে উপহার দেওয়া ভালো, কিন্তু সেই উপহার দাবি করে আদায় করা ভালো নয়। মেহমানদারি করা ভালো, কিন্তু সামর্থ্যের বাইরে খরচ করতে কাউকে বাধ্য করা উচিত নয়। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে থাকা ভালো, কিন্তু তার জন্য কারও ব্যক্তিগত অধিকার ও ধর্মীয় বিধান উপেক্ষা করা যায় না।

ইসলাম আমাদের ইনসাফ, দয়া, পারস্পরিক সম্মান এবং মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। অথচ আমরা অনেক সময় সামাজিক রীতিনীতিকে এত বেশি গুরুত্ব দিই যে সেগুলোর কারণে অন্য মানুষের ওপর যে জুলুম হচ্ছে, তা বুঝতেও চাই না।

কোনো প্রথা বহু বছর ধরে চলে আসছে বলেই সেটি সঠিক হয়ে যায় না। ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কাজের বিচার করতে হলে দেখতে হবে, তাতে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, কারও ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না।

পরিবর্তন শুরু হোক নিজের পরিবার থেকে

চট্টগ্রামের সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন একটি বিষয় ভুলে না যাই—চট্টগ্রামের সব পরিবারে এমন চিত্র নেই। এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, মেহমানদারি, দান-সদকা ও প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়ার মতো অনেক প্রশংসনীয় গুণও রয়েছে।

সমস্যা কোনো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নয়; সমস্যা এমন কিছু সামাজিক প্রত্যাশা ও আচরণের মধ্যে, যেগুলো মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে।

আপনি যদি একজন শাশুড়ি হন, তাহলে নিজের পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো সম্মান দিন। তাঁর বাবার বাড়ি থেকে কী এলো, কতটুকু এলো—সেই হিসাব না করে তাঁকে পরিবারের একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করুন।

আপনি যদি একজন ননদ হন, তাহলে ভাবুন, আপনার ভাইয়ের স্ত্রীও কারও আদরের মেয়ে। তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না, যা আপনার নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে হলে আপনি মেনে নিতে পারতেন না।

আপনি যদি একজন স্বামী হন, তাহলে স্ত্রীর সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বশীল হোন। পরিবারের অন্যায় আচরণকে নীরবে সমর্থন করবেন না।

আর আপনি যদি একজন মা-বাবা হন, তাহলে সন্তানদের বিয়েকে নিজের সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপলক্ষ বানাবেন না। বিয়ের পরও মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে নিয়মিত উপহার পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করবেন না।

মনে রাখবেন, আপনার কষ্টের ইতিহাস আপনার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি জীবনে শ্বশুরবাড়িতে অনেক কষ্ট করেছেন বলে আপনার পুত্রবধূকেও সেই একই কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে—এমন চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসুন।

আরও পড়ুন: এই গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলো স্মরণ রাখুন

বিয়ে দুটি পরিবারের সামাজিক প্রতিযোগিতা নয়

বিয়ে মূলত দুজন মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের বন্ধন। পরিবার এই বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার কারও নেই।

বিয়ের পর একটি মেয়ের নতুন পরিবার হয় ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সে নিজের বাবার বাড়ির প্রতি আজীবন দায়বদ্ধ থাকবে কিংবা শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেক সদস্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।

একটি ছেলে ও মেয়ে নতুন সংসার শুরু করবেন, নিজেদের মতো করে জীবন সাজাবেন, পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই হওয়া উচিত বিয়ের মূল সৌন্দর্য।

অথচ সামাজিক প্রতিযোগিতা, উপহারের হিসাব, লোকদেখানো আয়োজন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ অনেক সময় সেই সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সিফাতুন নূরের মৃত্যুর ঘটনায় যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আমাদের সমাজকেও ভাবতে হবে, উপহার ও আত্মীয়তার নামে এমন কী ধরনের প্রত্যাশা আমরা তৈরি করছি, যা মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

একটি মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে ৪৫০টি পিঠা এলো, নাকি ৪৫টি—এটি কোনোভাবেই তার সম্মান নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং মেয়েটি নতুন সংসারে কতটা ভালো আছে, কতটা নিরাপদে আছে, সেটিই হওয়া উচিত দুই পরিবারের সবচেয়ে বড় চিন্তা।

সামাজিক রীতিনীতি মানুষের জীবনকে সুন্দর করার জন্য, মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার জন্য নয়।

আসুন, উপহার দেওয়ার আনন্দকে দাবিতে পরিণত না করি। আত্মীয়তার সম্পর্ককে প্রতিযোগিতার জায়গায় নিয়ে না যাই। আর কোনো নারীকে যেন বাবার বাড়ির সামর্থ্য কিংবা শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশার বোঝা বহন করতে গিয়ে নিজের সম্মান, স্বাধীনতা কিংবা জীবন হারাতে না হয়।

আরও পড়ুন: ভারসাম্য রক্ষা করুন

পরিবর্তন অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা করার আগে নিজের পরিবার থেকেই শুরু হোক

আমার নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতা এই আর্টিকেলের ইতি টানতে চাই। আমার স্ত্রী তানজিনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসার কয়েক মাস পর আমাদের জীবনে প্রথম রমজান ও রোজার ঈদ আসে। সিলেটের সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী, আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে নানা রকম ইফতার পাঠানো হয়েছিল। সেগুলো পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিতরণ করা হয়। পরিবারের সদস্যদের জন্য এসেছিল ঈদের নতুন পোশাক। তাঁরা আরও কিছু দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি বিনয়ের সঙ্গে মানা করেছিলাম।

কারণ, আমি বিশ্বাস করি, আর্থিক টানাপোড়েন কমবেশি সব পরিবারেই থাকে। নিজের সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রচলিত রীতির ষোলো আনা পূরণ করতে গিয়ে অন্যের কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। উপহার তখনই সুন্দর, যখন তা আসে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা থেকে; কোনো সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে নয়।

এর কয়েক মাস পর আমাদের ঘর আলো করে এলো আমার রাজকন্যা। পরিবারে আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন অক্ষত থাকল না। মাত্র দুই মাস পর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার প্রাণের বন্ধু এবং তানজিনার বড় ভাই তাজুল ইসলাম আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তাঁর এক বছরের ছোট্ট রাজকন্যাকে।

মুহূর্তের মধ্যেই একটি সাজানো সংসার এলোমেলো হয়ে গেল। ভাই হারানো বোনদের, স্বামী হারানো স্ত্রীর আর সন্তান হারানো মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠল চারপাশ। সেই শোকের ছায়া আজও তাঁদের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। ছোট্ট মেয়েটি এখনো তার বাবাকে খুঁজে ফিরে। অথচ যে মানুষটি তাকে বুকের মধ্যে আগলে রাখতেন, তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না।

এর কয়েক মাস পর আবারও ফিরে এলো পবিত্র রমজান। স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে এলো ইফতার পাঠানো ও ঈদের পোশাক উপহার দেওয়ার সেই সামাজিক রীতি। আমি তানজিনাকে বলেছিলাম, সে যেন পরিবারের সবাইকে জানিয়ে দেয়, এসব নিয়ে যেন কেউ চিন্তা না করেন। তাঁদের ওপর যেন কোনো বাড়তি চাপ না পড়ে।

একদিন ইফতারের পর আমার শাশুড়ি মা ফোন করলেন। জানতে চাইলেন, কীভাবে কী করা যায়, কাকে কী দেওয়া যায়। আমি তাঁকে সরাসরি বললাম, “মা, আপনাকে কিছুই করতে হবে না। আমি সবকিছু সামলে নেব, ইনশা-আল্লাহ।” তারপরও তিনি কিছু দিতে চাইলে আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে নিরস্ত করি।

আমার ভাবনাটা ছিল খুব সাধারণ—যেখানে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের জন্য কিছু করা আমারই দায়িত্ব, সেখানে সামাজিক প্রথার বেড়াজালে তাঁদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই মানবিক আচরণ হতে পারে না। তাঁদের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার চেয়ে তাঁদের মুখে একটু স্বস্তি ও হাসি দেখতে পাওয়াই আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও একটি বিষয় বুঝিয়েছে—মানুষের জীবনে উপহার, উৎসব কিংবা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও বড় হলো মানুষ নিজে। যে পরিবারে শোক নেমে এসেছে, যে মা সন্তান হারিয়েছেন, যে স্ত্রী স্বামী হারিয়েছেন, যে শিশু বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাদের কাছে সামাজিক প্রথার হিসাব চাওয়ার আগে তাদের কষ্টটা বোঝা জরুরি।

আমরা অনেক সময় মানুষ হারানোর পর তাঁর জন্য কাঁদি, ভালোবাসার কথা বলি, স্মৃতিচারণ করি। অথচ মানুষটি বেঁচে থাকতে তাঁর কষ্ট বুঝতে, পাশে দাঁড়াতে কিংবা সামান্য চাপ কমিয়ে দিতে কতটুকু চেষ্টা করি?

উপহার ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার পরীক্ষা নয়। সামাজিক রীতি কখনো মানবতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

তাই পরিবর্তন অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা করার আগে নিজের পরিবার থেকেই শুরু হোক। স্বামী অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলুক, পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সীমাবদ্ধতা বুঝুক, আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে কাউকে কিছু দিতে বাধ্য না করুক। মনে রাখতে হবে, মানুষকে ভালোবাসা ও সম্মান জানানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় সে যখন জীবিত, যখন সে আমাদের পাশে আছে। মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে জীবিত অবস্থায় তার কষ্ট ভাগ করে নেওয়া অনেক বেশি মূল্যবান।

কারণ উপহারের মূল্য তার দামে নয়, আর মানুষের মূল্য তার দেওয়া উপহারে নয়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতায়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে অন্যের অধিকার রক্ষা করার, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার এবং পরিবারে শান্তি ও ভালোবাসা বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন: নারীর সঙ্গে আপনার আচরণ যেমন হবে!


তথ্যসূত্র ও ফুটনোট

  1. প্রথম আলো, “বাবার বাড়ি থেকে নাশতা কম পাঠানোর অভিযোগ, মারধরে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু”, ২৪ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনটি পড়ুন। ↑
  2. প্রথম আলো, একই প্রতিবেদন। নিহতের মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ৪৫০টি পিঠা, ৪০টি পেয়ারা, মাছ, আপেল, ড্রাগন ফল ও দুধসহ বিভিন্ন খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। এগুলো পরিবারের দেওয়া তথ্য, স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তালিকা নয়। মূল প্রতিবেদন। ↑
  3. দৈনিক আজাদী, “পটিয়ায় নাস্তা নিয়ে গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় শাশুড়ি গ্রেপ্তার”, ২৫ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনে নিহতের পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর স্বামীর ভিন্ন বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনটি পড়ুন। ↑

আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না

সামাজিক রীতিনীতির নামে উপহার দাবি, শ্বশুরবাড়িতে নারীর ওপর মানসিক নির্যাতন কিংবা পারিবারিক হস্তক্ষেপ—এসব বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা ও মতামত কী? মন্তব্যে জানান। আপনার একটি সচেতন মতামতও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন হোন, নারীর সম্মান ও অধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়ান।

Exit mobile version