বাসররাতেই প্রত্যাখ্যাত হয়ে পালিয়ে যাওয়া এক যুবক, আর সেই রাতেই দুই পরিবারে নেমে আসা আকস্মিক মৃত্যুর শোক — বারো বছর পর যখন তারা আবার মুখোমুখি হয়, নিয়তি কি তবে অন্য কোনো পথ রেখেছিল তাদের জন্য? “বিদিশা” এক জটিল, মর্মস্পর্শী পুনর্মিলনের গল্প।
বিদিশা — গল্পের সারসংক্ষেপ
বিধবা মা মনোয়ারার আবদারে আমেরিকা যাওয়ার আগে তড়িঘড়ি বিয়ে করে রায়হান, কিন্তু বাসররাতেই স্ত্রী সারাহ তাকে প্রত্যাখ্যান করে। সেই রাতেই রায়হান ঘর ছাড়ে, আর সারাহর বাবা জামশেদ সাহেব আকস্মিক হৃদরোগে মারা যান। বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে মনোয়ারাও চলে যান, উইল করে যান ছেলের বউ সারাহর নামে। বারো বছর পর আমেরিকা প্রবাসী অধ্যাপক রায়হান যখন ফিরে আসে নিজের মায়ের বাড়িতে, মুখোমুখি হয় সেই সারাহর, যিনি এখন সেই বাড়িরই মালিক — আর নতুন করে শুরু হয় দুজনের এক অপ্রত্যাশিত পুনর্মিলনের গল্প।
জামশেদ সাহেব। খুব ভালো মানুষ। শিক্ষক ছিলেন, জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে রিটায়ার্ড।
অবসরের পর তাঁকে নিয়ে শিক্ষিতমহলে চাপা হাসির খ্যাতি আছে। কারণ, শিক্ষা – শিক্ষা ছাড়া আর কোনও কথা বা প্রসঙ্গ তার জীবনে নেই। সুযোগ পেলেই মাছবাজারেও শিক্ষার সপক্ষে একটা ছোটোখাটো বক্তৃতা দেন। দুর্নীতি কখনও করেননি জীবনে। এক ধরনের অভিজাত দারিদ্র্য তার অবয়বে। তবু চালাকেরা তাকে বোকা বলে বেশ আনন্দ পান।
জামশেদ সাহেবের দুই ছেলে দুজনেই শিক্ষক। একটি মেয়ে কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে। মেধাবী। দুই ছেলের পেশায় আর মেয়েটির প্রতিভায় তিনি সন্তুষ্ট। টোটো করে ছাত্রছাত্রী গার্ডিয়ানদের বাড়ি বাড়ি ঘোরেন আর শিক্ষার পক্ষে উৎসাহ দেন। কৃতজ্ঞতা জানান, স্বপ্ন ফেরি করেন।
রায়হানের মার সঙ্গে জামশেদ সাহেবের ইদানীং খুব খাতির। ২৫ বছরের বিধবা । একটি মাত্র ছেলে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের উজ্জ্বল ছাত্র। প্রাইমারি শিক্ষিকা মনোয়ারা বেগমের সারাজীবনের অর্জন আর অবলম্বন রায়হান প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারারও হয়েছে সাততাড়াতাড়ি।
জামশেদ সাহেব আর বেগম মনোয়ারা একটা ষড়যন্ত্র করে ফেলেছেন! মনোয়ারা ছেলেকে জানাননি। জামশেদ সাহেব তার মেয়ে সারাহ আর ছেলেদেরকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।
রায়হান আমেরিকান এক ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ পেয়ে খুব ব্যস্ততায় প্রায় সকল কাজ সম্পন্ন করে সিলেটের বাসায় এসেছে।
: মা বললেন, আমি তোকে আমেরিকায় যেতে দেবো না।
: কেন মা?
: আমার পৃথিবীতে আর কেউ নেইরে বাপ!
: আমাকে যেতে হবে মা! এ সুযোগ এদেশের কোনও ছেলে পায় না। পেয়ে ছেড়েছে এই উদাহরণ তোমার ছেলে হতে পারে না।
: মা রাগ করেন। কথা বন্ধ করেন। রাতে আবদার করেন—আমি একটা মেয়ে দেখে রেখেছি, তাকে বিয়ে করে আমার কাছে রেখে যা। তা না-হলে আমাকে মেরে রেখে যা!
: রায়হান বলে ঠিক আছে। মেয়েটি কে, দেখতে কেমন কিছুই সে জানতে চায় না। মা খুশি থাকবেন, … তার পিএইচ.ডি হবে আর কোনও চিন্তা তার নেই ৷
জামশেদ সাহেবের কন্যা সারাহর সঙ্গে সুন্নতি বিয়ে হলো রায়হানের। মেয়ে দেখে রায়হান খুশি। রূপবতী মেয়ে, নব্য যুবকের কাছে এর চেয়ে আশু কাম্য কী-ই হতে পারে!
গোল বাঁধলো বাসররাতে। সারা উদ্ধত প্রশ্ন রাখলো…
—আপনি উচ্চশিক্ষিত আর মেধাবী হলেও ভালো মানুষ না। আধুনিক না। আপনার সঙ্গে আমি সংসার করব না, কখনও না ।
চিরদিনের ভালো ছেলেটি ঘর পালালো। মায়ের জন্য চিরকুট রেখে— ‘যাচ্ছি মা, চিরদিনের জন্য।’
ভোরের প্রথম আলোয় সারাহ পৌঁছালো তার বাবার বাসায়। দুপুরের মধ্যে দুই পলায়নই জানাজানি হলো। আসরের সময়ে মাইকিং হলো ‘ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন। ১ অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার জনাব জামশেদ আহমদ অদ্য হার্ট এটাকে ইন্তেকাল করিয়াছেন’।
সারা শহরে বড়ো মাতামাতি। এত ভালো মানুষ, শিক্ষাদরদি মানুষ, এই শহরে আর কেউ রইলো না। জীবনে প্রথম শোনা গেল এই শহরে এত মহৎ আর শিক্ষাদরদি জ্ঞানী মানুষ ছিলেন জামশেদ। না, বোকা কেউ বলল না আজ৷
মনোয়ারা বেগম বেঁচে থাকলেন কয়েক মা। রিটায়ার করা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। ছেলের খোঁজ করেননি – ছেলেও না। বিদায় সংবর্ধনা নিয়ে পুষ্পিত মৃতপ্রায় মুখ নিয়ে ফিরেই শয্যা নিলেন।
৩ দিন মাত্র, তার পরই ঘুম থেকে আর উঠলেন না। ঘনিষ্ঠ তেমন কেউ ছিলেন না। পড়শিরা জানলেন এবং জানালেন। তার সেকেলে টিনের চালার ঘরটি এবং ছায়াঢাকা বিশাল বাড়িখানা ছেলের বউয়ের নামে উইল করেছেন। ছেলের মালিকানার উল্লেখ নেই তবে বউমা সারাহ শবনমকে তার সকল স্থাবর অস্থাবর আর রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট দিয়েছেন মনোয়ারা। খবর পেয়ে সারাহ হাউমাউ করে কাঁদলো। ভাই-ভাবিদের না-জানিয়ে তার আরোপিত সংসারে উঠল সেদিনই।
রায়হান নিউইয়র্কে বসে মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনলো, কাঁদলো না। বুকে বেজেছিল কি না কে জানে। এদেশে একযুগ বলে একটা কথা আছে। ১২ বছর সময়ের এক বিশাল ইউনিট ধরা হয় যুগকে ২।
হ্যাঁ, বারো বছর পর মনোয়ারা মঞ্জিলের সামনে এসে আমেরিকান পদার্থবিদ রায়হান আহমদের গাড়ি থামলো। অট্টালিকা ধরনের বাড়ি। প্রফেসর সারাহ আহমদের নেমপ্লেটও আছে ভেতর বাড়ির মূল ফটকে।
কী করবে রায়হান? একজন গৃহকর্মী এসে লিভিংরুমে সসম্মানে বসিয়ে বলল, খালাম্মাকে কী বলব স্যার?
আমতা আমতা করে রায়হান বলেন, আমি রায়হান আহমদ মনোয়ারা বেগমের ছেলে…।
সারাহ আগন্তুকের সংবাদ পেয়ে থমকে যায়। কয়েক সেকেন্ড আকাশ মাটির মাঝখানে ঝুলতে থাকে।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ডে গোটা অতীত মুছে দেয় মন থেকে।
খুব স্বাভাবিকভাবে লিভিংরুমে ঢুকে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, আমি মিসেস রায়হান। আমার শাশুড়ি এখানে আমার আর তার সম্পদ তার ছেলেকে সমঝে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আপনি চাইলে আমি তা এক্ষুনি আপনাকে সমঝে দিতে পারি।
চোখ খুলে তাকালেন রায়হান, স্থির অকম্পিত কণ্ঠে বলেন, আমি আজ অনাধুনিক নই সারাহ। আমাকে নিতে না-চাইলে আজও চলে যেতে পারি সারাহর ভেতরের নারী কীভাবে যেন তাঁকে ঠেলে দেয় রায়হানের পায়ের দিকে।
কিন্তু তা-ও কী সম্ভব !
তিনি রায়হানের প্রশস্ত বুকে নিজেকে বেতস লতার মতো কম্পিত এক কিশোরী হিসেবে আবিষ্কার করেন। নির্বাক এবং বিদিশা ।
গল্প থেকে শিক্ষা
“বিদিশা” আমাদের দেখায়, তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত কীভাবে একাধিক জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। মায়ের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে রায়হান যে তাড়াহুড়ো করে বিয়েতে রাজি হয়েছিল, তার পরিণতি দুই পরিবারকেই গভীর শোক আর একাকীত্বের মধ্যে ফেলে দেয়।
গল্পটি আরও শেখায়, সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা কখনো কখনো তাদের নিজেদের চাহিদাকে ছাপিয়ে যায়। মনোয়ারা বেগম ছেলের সুখের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন, এমনকি মৃত্যুর পরও নিজের সম্পদ ছেলের বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন — এটি নিঃস্বার্থ মাতৃত্বের এক গভীর দৃষ্টান্ত।
সারাহর চরিত্রের পরিবর্তনও গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এক সময়ের উদ্ধত, প্রত্যাখ্যানকারী তরুণী বারো বছর পর যখন পরিণত, দায়িত্বশীল এক নারী হিসেবে রায়হানের মুখোমুখি হয়, তখন বোঝা যায় সময় আর অভিজ্ঞতা মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে।
সবশেষে, “বিদিশা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — জীবনের অপ্রত্যাশিত মোড়গুলো কখনো কখনো পুরনো ক্ষত সারিয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, যদি মানুষ অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখে।
- মন্ত্র
- •
- জিনের ধর্ম
- •
- নিয়তি
- •
- বাণ
- •
- শিকড়
- •
- সালিশ
- •
- শেষের আলোয়
- •
- সন্ধি
- •
- ৭ দফা
- •
- মকচৌ
- •
- মিস্টার টমি
- •
- সিক্ত শিশির
- •
- গুরুদক্ষিণা
- •
- আসমা
- •
- আফসানা
- •
- গল্প বুড়ি
- •
- কলঙ্ক
- •
- সস্তা মেয়ে
শেষ কথা
“বিদিশা” আমাদের এক গভীর উপলব্ধি দেয় — জীবন কখনো কখনো সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত পথেই আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উত্তর এনে দেয়। রায়হান আর সারাহর এই জটিল, মানবিক যাত্রা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী এক অনুভূতি রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও মর্মস্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
তথ্যসূত্র ও বহি:গমণ লিংক
- “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” — পবিত্র কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:১৫৬; বিপদ বা মুসিবতের সময় উচ্চারিত এই বাক্যের অর্থ—“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।” কুরআন ২:১৫৬ ↑
- বাংলা অভিধান অনুযায়ী, “যুগ” শব্দের একটি অর্থ হলো বারো বছর সময়। বাংলা একাডেমি — আধুনিক বাংলা অভিধান ↑

