এক কিশোরী বধূকে প্রত্যাখ্যান করে ভুলে যাওয়া হয়েছিল এক ছেলেখেলা হিসেবে। সতেরো বছর পর সেই মেয়েই ফিরে এলেন আদালতে, বোরকার আড়াল থেকে — ন্যায়বিচার, ক্ষমা আর আত্মসম্মানের এক অবিশ্বাস্য রূপে। “আসমা” ধৈর্য আর বিশ্বাসের এক মহাকাব্যিক গল্প।
আসমা — গল্পের সারসংক্ষেপ
মাত্র পনেরো বছর বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে হয় আসমার, যাতে তার স্বামী ফারহান বিদেশে পড়তে যেতে পারেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে ফারহান সেই বিয়েকে “ছেলেখেলা” বলে প্রত্যাখ্যান করে। একের পর এক ট্র্যাজেডি সহ্য করে আসমা পালিয়ে ঢাকায় আসে, আইন পড়ে ব্যারিস্টার হয় এবং ডিজাইনার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়—অথচ তার পুরনো পরিবার জানতেই পারে না সে বেঁচে আছে। সতেরো বছর পর এক সম্পত্তি মামলায় আদালতে মুখোমুখি হয় সবাই, যেখানে আসমা নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে ন্যায়বিচার আর ক্ষমার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এই অঞ্চলের কোনও মানুষ কোনওদিন শুনেনি যে হাইকোর্টের মামলা গ্রামসালিশে আসতে পারে। কোর্টের বাইরে আপোশ নিষ্পত্তির একটা সুযোগ দিয়েছে বিচারবিভাগ।১ সেই সূত্রে দুই পক্ষের উকিল ব্যারিস্টার আর কিছু জ্ঞানী শুভানুধ্যায়ী এসেছেন সুন্দরনগর গ্রামে।
বিশাল এক কাছারিঘরে বসেছে সভা। ৫/৬ গ্রামের মানুষ বহুল আলোচিত মামলার আপোশ বিষয়ে জানতে জড়ো হয়েছে বাড়ির চারপাশে।
আহমদ আলী আর মাহমুদ আলী দুই ভাই। আহমদ আলী আলিম মানুষ, কৃষিকাজই তার পেশা। মাহমুদ আলী ননম্যাট্রিক, তিনিও সচ্ছল গেরস্ত। আহমদ আলী অনেক বেশি বয়সে একটি কন্যা সন্তানের জনক হয়েছেন। অপর পক্ষে মাহমুদ আলীর ৪ মেয়ে আর এক ছেলে।
মাহমুদ আলী ৪ মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ফারহান আহমদ এম এস সি রসায়নশাস্ত্রে।
আহমদ আলীর কন্যা আসমা ১৫ বছর বয়সি – মাদ্রাসার ক্লাস নাইনের ছাত্রী। ফারহান বিদেশে পড়াশোনায় আগ্রহী, ব্রিটেনের কোনও কলেজে ভর্তি হতে পারবে। মাহমুদ আলী এত টাকাপয়সা জোগাতে পারবেন না। তাই বাপ ছেলেতে বেশ টানাপড়েন।
কথাটা কানে গেছে আহমদ আলীর। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে পরামর্শ করলেন। ডাকলেন ছোটো ভাইকে।
আসমাকে তুই যদি ছেলের বউ করে নিস তাহলে ওর বিলেত যাবার খরচ আর পরবর্তী কালে যা লাগে আমিই করব। আম্মাও এই পরামর্শ দিচ্ছেন। তুই দেখ। মাহমুদ আলী খুশি হয়েই রাজি হলেন।
বড়ো ভাই বললেন, তুই রাজি হলে তো হবে না। তোর বউ এবং ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করে বল।
মাহমুদ আলীর বউ না না করেও রাজি হলেন। তার ইচ্ছে ছিল ছেলে মেম বিয়ে করবে। হলো না। ছেলে প্রথমে রাজি হলো না। তার যে প্রেমিকা আছে সেও মা-বাবাকে বলতে পারলো না । আসমাকে বিয়ে করা ছাড়া তার বিদেশ যাবার স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে না দেখে রাজি হলো । কথা হলো আদ হয়ে থাকবে – কনের বয়স আঠারো হলে ঘরে উঠবে বউ হয়ে।
মাহমুদ আলী বললেন, কাবিননামা রেজিস্ট্রেশন আমি করাবো, মোহরানা হিসেবে তুই বাড়ির ৫ বিঘা জমি দিবি।২ আমার সবটাই তো মেয়ে আর জামাই পাবে। ফারহান বিদেশে যাচ্ছে – উলটাপালটা করলে ভিটেবাড়ির তার অংশের দায়টা তার থাক । মানুষের মন তো রং বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। ঘটলও তাই । আসমা বিয়ের আগে ফারহানের সামনে বেরোত – কথাবার্তা বলতো, বিয়ে হলে তাও বন্ধ হয়ে গেল। ফারহানের তরফে নতুন বউ দেখার বা কথা বলার গরজ ছিল না।
সে ঢাকায় গেল এবং লন্ডনেও পাড়ি জমালো।
এক বছর পর সে প্রথম চিঠি লিখল আসমাকে। তোর সঙ্গে বিয়েটা এক ছেলেখেলা ছিল। ভুলে যাস এটি। গ্রাম্য অশিক্ষিত একটা মেয়ে নিয়ে আমি সংসার করতে পারবো না। আর ওই কাগুজে বিয়ের কথা পরিবারের বাইরে তো কেউ জানে না। তুই কাউকে নিশ্চয়ই পাবি। ইত্যাদি।
আসমা চিঠির কথা দাদিকে জানালো তার কী করণীয় জানতে। বুড়ি অসুস্থ ছিলেন এই খবরে স্ট্রোক করলেন। নির্বাক ৩/৪ দিন বেঁচেছিলেন, তারপর চোখ মুদলেন।
এস এস সি পরীক্ষা দিলো সে, ভালো হলো পরীক্ষা। পরীক্ষার পর পর বাবা তাকে বিবাহ সম্পর্কে ইসলামের বিষয়াদি বোঝাতে শুরু করলেন। আসমা শোনে আর কাঁদে।
বাবা একদিন বললেন, মা আয়েশাকে আদর্শ মানিসরে মা। শৈশবে শাদি হয়েছিল তাঁর। নবীজীর সংসারে ৯ বছর ছিলেন৩। দুনিয়ার মুসলিম নারীকুলের জন্য দ্বীনের যথাযথ পথটি তিনিই দেখিয়েছেন। আমি জানি না রে মা তোকে বিয়ে দিয়ে ভুল করেছি কি না। ভুলও যদি করে থাকি তুই তাকে ফুল করে তুলিস। কথা দে মা, তুই আমার কথা রাখবি। আমাদের এই ক্ষয়িষ্ণু পরিবারটিকে উজ্জ্বল করে তুলবি তুই।
আসমা কেঁদে ওঠে ডুকরে। আর কান্না জড়ানো কণ্ঠে জানায় সে কথা দিচ্ছে।
সেদিনই সে ফারহানকে চিঠি লিখে, ‘আপনার চিঠি পেয়েছি। পরীক্ষা, দাদির মৃত্যু, আব্বার অসুস্থতার জন্য উত্তর দিইনি। আপনার যোগ্য আমি নই সেটা আমি জানি। জানি বলেই কোনও অধিকার কখনও দাবি করব না, ওয়াদা দিচ্ছি। তবে হ্যাঁ, কাগুজে বিয়েটিই আল্লাহর নামে রাসুলের সুন্নতের অসিলায় হয়েছে বিধায় আমি এর অধীনে সারাজীবন থাকতে চাই, থাকবো ইনশাআল্লাহ। আপনি আপনার সুখশান্তির জন্য যা প্রয়োজন করুন আমি আপত্তি করছি না, করব না। আশা করি আপনি আমাকে যে মনোভাব জানিয়েছেন বাড়ির অন্য কাউকে তা জানাবেন না। আপনার চিঠির মর্মার্থ শুনেই দাদি ইন্তেকাল করেছেন। আমি চাই না আর কারও ওপর আমার দুর্ভাগ্যের ছায়া পড়ুক। ভালো থাকবেন।’
চিঠি পড়ে ফারহান রাগে কাঁপতে থাকে। সে তার শ্বশুরকেও কথিত বিয়ের অসারতা জানিয়ে চিঠি লেখে। বড়ো চাচা চিঠি পেয়ে হতভম্ব হয়ে যান, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার ইচ্ছে জাগে কিন্তু মেয়ে যে তা জেনে যাবে। অতএব নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হন এবং মায়ের মৃত্যুর ছ’মাসের মধ্যে কবরবাসী হন।
বাবার মৃত্যুর পর অসহায় মেয়েটি শ্বশুরশাশুড়ির মনোভাবও জেনে যায়। ইন্টারমিডিয়েট পড়বার আশায় একমাত্র মামার আশ্রয়ে যায়। কিন্তু দুমাসেই মামির নির্যাতন তাকে মোহমুক্ত করে দেয়।
ভাগ্য সব দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিল তার। পত্রমিতালি বলে একটা বিষয় তখন চালু ছিল। মহানগর ঢাকার একটা মেয়ে মাসুমা শেলির সঙ্গে পত্রমিতালি ছিল তার। খুব সংযতভাবে সে তার কাহিনি শেলিকে লিখে যাচ্ছিল। শেলি জানায় তার বাসার দরজা আসমার জন্য চিরদিন খোলা আছে, থাকবে । সে তাকে দিনতারিখ জানিয়ে বলে, যে কোনও উপায়ে চলে আয় ভাই । ওই নরকে আর একটা দিনও পড়ে থাকিস না।
অতি সংগোপনে আসমা বাবার ব্যাংকে জমানো ২৫ হাজার টাকা তুলে নেয় আর পাড়ি জমায় ঢাকায়।
আল্লাহর রহমতে একা মেয়েটি সহিসালামতে ব্যারিস্টার ইদ্রিসের বিলাস বহুল অট্টালিকায় পৌঁছে যায়।
শ্বশুর মহাশয় গ্রামময় রটিয়ে দিলেন কুলটা মেয়েটি, কোনও ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে। আল্লাহ তার আর তার ছেলের জীবনকে অভিশাপমুক্ত করেছেন।
সুসময় বড়ো দ্রুত পালায় মানুষের জীবন থেকে। ফারহান আহমদ সহপাঠিনীকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। বিয়ে করেন। দুজনে ডক্টরেট করে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিও পেয়ে যান। দশ বছর স্বপ্ন আর সাধনার ঘোরে কেটে যায়। অবশেষে তার স্ত্রী ড. নাজমার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। ডাক্তাররা যখন নিরাশ হয়ে Pray, Pray বলতে শুরু করেন তখন তার ঘোর কাটে। তিনি স্ত্রীকে বলতে শুরু করেন আমার পাপে তুমি মরতে বসেছো।
স্ত্রী বলেন, না আমার পাপেই আমি মরছি। যদি পারো আসমাকে খুশি রেখো। আমি জেনে শুনে একটা নিষ্পাপ সুন্দর জীবন থেকে তোমাকে বিচ্যুত করেছি।
পাপবোধের প্রবল কষ্ট নিয়ে নিঃসন্তান নাজমা চলে গেলেন ওপারে।
ডক্টর ফারহান এখন বড়ো একা, দেশে এসে দেখলেন বাবাও যাবেন-যাবেন অবস্থা। তাকে পেয়ে খুব খুশি। ভাইয়ের গোটা সম্পত্তি জাল দলিলে আত্মসাৎ করেছেন। নিজের মেয়েদেরকে কানাকড়ির সম্পদ না-দিয়ে একমাত্র বংশপ্রদীপ ফারহানের নামে করে রেখেছেন। এগুলো সমঝে রাখো। কেউ কানাকড়িও পাবে না। মেয়েরা তো সুখেই আছে আর ওই ছুড়িটা পালিয়ে গিয়ে তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
ফারহান চেঁচিয়ে ওঠে। আব্বা এসব রাখেন, আল্লাহকে স্মরণ করেন। সবাইকে ঠকিয়ে আমাকে সম্পত্তি দিচ্ছেন। আমি কাকে দিয়ে যাবো ভেবেছেন একবারও।
দুনিয়ার লোভ যাকে অন্ধ করে দিয়েছে তিনি পুত্রের কথা বুঝতে পারলেন না। বললেন, তোর মা’র সঙ্গে বোঝাপড়া করিস বাবা। তিনবার হিক্কা উঠলো তার, তারপর ঠান্ডা হলেন চিরতরে।
ছেলে লন্ডন চলে যাবে। মাকে বার বার বলছে, আসমাকে খুঁজে বের করো মা। আমি একবার অন্তত তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চাই। নইলে আমার জীবনটা নরক হয়ে রইবে।
মা বলেন, নষ্টা মেয়েটার কথা মুখেও নিস না। কোনও খারাপ-পাড়া নয়ত জাহান্নামে চলে গেছে তাকে খুঁজে কোনও লাভ হবে না। উলটো মা বিভিন্ন স্ট্যাম্পে দস্তখত করান। এসব কেন আম্মা, জিজ্ঞেস করে পুত্র।
মা বলেন, তুই বুঝবি না। সাইন কর। সব তোর জন্য তোর মঙ্গলের জন্য। ঝগড়া করতে মন চায় না ফারহানের। রাগ করবে কার ওপরে! এই মা ছাড়া পৃথিবীতে তার আপন কেউ নেই আর।
আসমা ব্যারিস্টার ইদ্রিসের বাসায় উঠলো একান্ত আপনজনের মতো। ব্যারিস্টার গিন্নি আর ইদ্রিস সাহেব যেন দ্বিতীয় একটি মেয়ে পেলেন। শেলি সবকিছু জানিয়েছে তাই তারা আর বেদনা খুঁড়লেন না। ব্যারিস্টার দম্পত্তির বড়ো দুই ছেলে, একজন আমেরিকায়, দ্বিতীয় জন তার সহকারী আইনজীবী। ব্যারিস্টার আরিফের স্ত্রীও আইনজীবী। এটি যেন এক আইনের ঘর। কিন্তু বড়ো হৃদয়বান প্রাণখালা প্রতিটি মানুষ।
ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলো আসমা ইডেন কলেজে। মেধাতালিকায় স্থান পেলো গ্রামের মাদ্রাসা পড়া মেয়েটি। এ ঘরে ঢুকেই সে জেনেছিল সে আইন পড়বে, আইনই পড়ল।
শেলিই আবিষ্কার করেছে ডিজাইন করার ব্যাপারে আসমার প্রকৃতিগত প্রতিভা। বিভিন্ন ডিজাইন হাউসের সঙ্গে আসমাকে পরিচয় করিয়ে দিল সে। আর এ আহমদ নামের এক আনকোরা ডিজাইনার প্রফেশনালি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল রাতারাতি । প্রচণ্ড পরিশ্রমী মেয়েটি। দশ বছরে ব্যারিস্টার হলো, খ্যাতিমান ডিজাইনার হলো। কিন্তু তার পরিচিত ফেলে আসা পৃথিবীর কেউ সে-খবর জানলো না।
আরও পাঁচবছর পর মাহমুদ আলী পরিবারে মা-মেয়েতে সম্পত্তি নিয়ে আইনি যুদ্ধ শুরু হলো। চার মেয়ে দাবি করল পৈতৃক সম্পত্তি যা বেআইনিভাবে ভাই ডক্টর ফারহানের নামে দিয়ে দেওয়া হয়েছে পাওয়ার অব এটর্নির বলে, মা রাবেয়া খাতুন ছেলের পক্ষে লড়ে চলছেন।
গড়াতে গড়াতে সেই মামলা হাইকোর্টে উঠলে পরে চূড়ান্ত পর্যায়ে আজ আপোশ রফার এই আয়োজন। ডক্টর ফারহানের বসতবাড়িতে অর্থাৎ সরেজমিনে আজকের ঐতিহাসিক বিচারসভা।
দুপক্ষের ব্যারিস্টার আছেন, কোর্ট নির্ধারিত জুরি আছেন দুজন। সর্বোপরি ব্যারিস্টার ইদ্রিসের ল’ ফার্মের একজন প্রতিনিধিও ডক্টর ফারহানের উপদেষ্টা হিসেবে হাজির হয়েছেন।
সকাল দশটায় দেখা গেল একজন ভগ্নস্বাস্থ্য চল্লিশ বছর বয়সি মানুষ হলরুমের একেবারে পেছনে বসেছেন। কোর্ট নয় এই অর্থে যে কোর্টের চেয়ে একটু শিথিল আচরণের একটি মহাকোর্ট মনে হচ্ছে এটিকে।
একজন উকিল সাহেব বিষয়বস্তু অর্থাৎ মেয়েদের দাবির বিষয়টি তুলে ধরলেন শুরুতে। পেছনের ভগ্নস্বাস্থ্য লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার পক্ষে ব্যারিস্টার ইদ্রিসের ফার্ম থেকে একজন প্রতিনিধি থাকার কথা আছে তিনি কি আছেন? কালো বোরকা ও নেকাব পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে বললেন, জি, আমি আছি।
পেছনে বসা লোকটি বলল, আমি ফারহান আহমদ এই বিষয়ের দ্বিতীয়পক্ষ। আমি আপনাকে বলছি আইনের নৈতিক মূল্যবোধ থেকে আমার বক্তব্য দিয়ে দিলে আমার মনে হয় সকল পক্ষের সন্তুষ্টি এবং সমঝোতা খুব সহজ হবে।
মহিলা বললেন, জনাব ফারহান আপনি কি আমাকে এই মামলাভুক্ত সকল সম্পত্তির ন্যায্য সকল পক্ষ ও ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার দিচ্ছেন । ফারহান বললেন, নিশ্চয়ই দিচ্ছি।
মহিলা শুরু করলেন। মামলার জুরিবৃন্দ ও আইনজীবী মহোদয়গণ —
আমি ব্যারিস্টার মিসেস এ আহমদ। আমার ও জনাব ফারহান আহমদের এফিডেভিট আপনাদের কাছে পেশ করেছি। ফারহান আহমদ আমাদের ফার্মকে এই সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশীদার প্রত্যেককে যার যার ন্যায্য অংশ নির্ধারণের অধিকার প্রদান করেছেন।
তাই এখানে তার বোনেরা সম্পত্তির যে দাবি দিয়েছেন তা তারা পেতে কোনও বাধা থাকছে না।৪ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে সম্পত্তি ফারহান আহমদ তার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে দলিলদস্তাবেজের মাধ্যমে কোর্টে সাবমিট করেছেন, সেটির আর কোনও মালিক আছেন কি না সেটি আমাদের খুঁজে দেখতে হবে।
দুজন উকিল বললেন, না তেমন দাবিদার কেউ নেই। উকিল দুজন রাবেয়া খাতুনের আর তার মেয়েদের পক্ষের। শান্ত কণ্ঠে মিসেস আহমদ বললেন, অবশ্যই আছেন, আহমদ আলী সাহেবের কন্যা আসমা আহমদ আছেন আবার সেই আসমাই ফারহান সাহেবের স্ত্রী হিসেবে তার মোহরানা বাবদে পাওনাদার আছেন।
একজন উকিল উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, মৃত ব্যক্তির মালিকানার প্রশ্ন এখানে উঠছে কেন? বিশেষত সেই মৃতের যখন উত্তরাধিকারী নাই । মিসেস আহমদ জানতে চাইলেন, সেই মৃত্যুর সার্টিফিকেট প্লিজ এক্সিবিট করুন।
আবারও দুজন উকিল দাঁড়িয়ে উত্তপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনিই তাকে হাজির করুন। ১৭ বছর যার কোনও পাত্তা নাই তাকে নিয়ে আপনি অযথা জটিলতা সৃষ্টি করছেন কেন?
মিসেস আহমদ পেছন ফিরে ফারহান আহমদকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রথম স্ত্রী আসমা মারা গেছেন বলে কোনও প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে, ডক্টর ফারহান?
ফারহান দাঁড়ালেন, কম্পিত কণ্ঠে বললেন, না আসমা মারা যাবার কোনও খবর আমি জানি না। আমার দৃঢ়বিশ্বাস সে বেঁচে আছে এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করার সুযোগ আল্লাহ আমাকে দেবেন।
ব্যারিস্টার মিসেস আহমদ আস্তে করে তার বোরখা খুললেন। নেকাব খুলে বললেন, মাননীয় জুরিবৃন্দ এই আমি, আমিই আসমা আহমদ।
এই আমার চাচিকে যিনি আমার শাশুড়িও বটে, আমার চাচাতো বোনদেরকে এবং আমার স্বামীকে অনুরোধ করছি তারা কি আমাকে দয়া কবে শনাক্ত করবেন? যদি না করেন, আমিও নিজেকে মৃত স্বীকার করব। আর তাদের সম্পত্তির বাটোওয়ারানামা আপনাদের কাছে পেশ করে বিদায় নেবো । অনেক কণ্ঠে আর্ত আওয়াজ উঠলো ‘আসমা’। এই তো আসমা। স্তম্ভিত বিচারসভা থমকে গেল যেন।
উদ্ভ্রান্তের মতো ফারহান সামনে ছুটে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন ব্যারিস্টার আসমার সম্মুখে।
আসমা বললেন, তুমি শান্ত হয়ে প্লিজ বসো।
মাননীয় জুরি সাহেবান আইনবিদগণ ও সংশ্লিষ্ট সম্মাননীয় সুধীজন। আমরা সকল দলিলদস্তাবেজ ঘেঁটে দেখেছি এই বাড়িতে ২৪ বিঘা ভূমি আছে। এর মধ্যে ১২ বিঘা আহমদ আলী সাহেবের উত্তরাধিকারী আসমা পান। ফারহান আহমদের দেওয়া মোহরানা হিসেবে আসমা পান আরও ৫ বিঘা। এই ১৭ বিঘার পর ৭ বিঘা পান ফারহান সাহেবের বোনেরা।
বোনেরা হাততালি দিলেন। এর বাইরের ৫৪ বিঘা ভূমির ২৭ বিঘা আসমার আর বাকি ২৭ বিঘার ২ দশমাংশ ফারহান সাহেবের এবং ১ দশমাংশ প্রত্যেক বোন পাচ্ছেন।
হ্যাঁ, একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে আমার চাচির স্বামীর সম্পত্তির ভাগ কোথায় গেল। তিনি তার প্রাপ্য অংশটুকু তার স্বামীর কাছে রেজিস্ট্রি দলিলমূলে বিক্রি করেছেন বিধায় তার সম্পত্তিটুকু তার ছেলেমেয়েদের ভাগে গেছে।
সবাইকে ধন্যবাদ।
উকিল সাহেবরা বড়ো কসরত করে এসেছিলেন কিন্তু তারা যাদের পক্ষে তারা যেভাবে সন্তোষ প্রকাশ শুরু করেছেন তাতে চুপ না-হয়ে তাদের উপায় ছিল না।
জুরিবৃন্দ সকল পক্ষের হাজিরি নিশ্চিত করলেন, সকল পক্ষের দস্তখত নিলেন।
অন্যদিকে আসমাকে নিয়ে মেতে উঠলেন চাচাতো বোনেরা। আসমা বলল, ‘আম্মা কোথায় আমার চাচি আম্মাকে নিয়ে এসো’। দুজনে ধরাধরি করে মহিলাকে আনলেন, ফ্যাকাশে মুখ, থর থর করে কাঁপছেন তিনি। আসমা তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। তারপর দুই হাত তার দুই গালে চেপে বলল, আম্মা তোমার কোনও অংশ রইল না, এই তো তোমার দুঃখ। ব্যারিস্টার আসমা আহমদ তোমাকে তার এখানকার গোটা সম্পত্তি লিখে দিয়েছে রেজিস্ট্রি দলিলমূলে। ব্রিফ কেইস খুলে দলিলটি তার হাতে দিলো আসমা। বৃদ্ধা দলিলটি হাতে নিলেন, তারপর হাতের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সেটিকে কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়লেন।
কাঁপা গলায় বললেন, আমাকে ক্ষমা করিস না রে মেয়ে আমাকে ক্ষমা করিস না। পারলে ফারহানকে ক্ষমা করিস। আমি অন্ধ ছিলাম, মরবার আগে চোখে আলো পেলাম, সত্য সুন্দর দেখলাম। আমি তোকে আল্লাহর জিম্মায় রাখলাম। মূর্ছিত হলেন তিনি।
বিচারসভা খুব কম সময়ে শেষ হলো বলে সকলে খুশি। কৃতিত্ব যে তাদের গাঁয়ের মেয়ের, সেটি সবার মুখে মুখে। ঘরে যাচ্ছে না আসমা। ভিড় তার চারদিকে।
ডক্টর ফারহানের কষ্ট হচ্ছিল প্রচণ্ড। শেষ পর্যন্ত ভিড় ঠেলেই সামনে এলেন তিনি। ‘আসমা আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?’
আসমা তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করে। ভয়ে তিনি ত্বরিত পা সরালেন। হাসলো আসমা। স্থির অচঞ্চল কণ্ঠে বলল, আমার আব্বা আমাকে আল্লাহর আইনে, নবী মোহাম্মদ (সা.) এর অসিলায় আপনার কাছে আমানত রেখেছেন। আমি সেই আমানতই আছি আর থাকবো ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি আমাকে ত্যাগ না-করে থাকেন তবে আমি আপনারই আছি। হ্যাঁ, আমি যাদের আশ্রিত তাদের কাছেই যাচ্ছি। আপনি তাদেরকে বলুন আপনার অধিকার তারা নষ্ট করবেন না।
গাড়িতে যখন উঠছে আসমা, ফারহান এ বাক্যটি আওড়ায়।
গল্প থেকে শিক্ষা
“আসমা” আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রত্যাখ্যানও একজন মানুষকে ভেঙে দিতে পারে না, যদি তার মধ্যে দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস থাকে। আসমা তার স্বামীর নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যান, পরিবারের অবহেলা আর একের পর এক ট্র্যাজেডি সহ্য করেও নিজের শিক্ষা আর পরিশ্রম দিয়ে এক নতুন জীবন গড়ে তোলে — এটি আত্মমর্যাদা আর অধ্যবসায়ের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
গল্পটি আরও দেখায়, প্রতিশ্রুতি আর বিশ্বাসের গুরুত্ব কতটা গভীর হতে পারে। বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে আসমা কখনো তার বিয়ের প্রতি অবিশ্বস্ত হয়নি, যদিও তার স্বামী তাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল — এই দৃঢ়তা তাকে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথে নিয়ে গেছে।
আদালতের দৃশ্যে আসমার আচরণ ক্ষমা আর ন্যায়বিচারের এক অনন্য মিশ্রণ তুলে ধরে। সে প্রতিশোধ নেয়নি, বরং আইনি ও নৈতিক উভয় দিক থেকে ন্যায্য সমাধান বের করে এনেছে — এমনকি যারা তার সাথে অন্যায় করেছিল তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল থেকেছে। এটি আমাদের শেখায়, প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, ক্ষমা আর ন্যায়বিচারে।
সবশেষে, “আসমা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আর নিজের প্রতি সম্মান বজায় রাখলে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও আলোর পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
- মন্ত্র
- •
- জিনের ধর্ম
- •
- নিয়তি
- •
- বাণ
- •
- শিকড়
- •
- সালিশ
- •
- শেষের আলোয়
- •
- সন্ধি
- •
- ৭ দফা
- •
- মকচৌ
- •
- মিস্টার টমি
- •
- সিক্ত শিশির
- •
- গুরুদক্ষিণা
- •
- আফসানা
- •
- গল্প বুড়ি
- •
- কলঙ্ক
- •
- সস্তা মেয়ে
শেষ কথা
“আসমা” আমাদের এক গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায় — ধৈর্য, বিশ্বাস আর আত্মমর্যাদা একজন মানুষকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি থেকেও বিজয়ী করে তুলতে পারে। এই গল্প পাঠকের হৃদয়ে গভীর এক অনুপ্রেরণা রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও শক্তিশালী ও মানবিক গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
তথ্যসূত্র ও বহিঃগমণ সংযোগ
- বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ৮৯A ধারায় আদালতের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার জন্য mediation বা মধ্যস্থতার বিধান রয়েছে। Code of Civil Procedure, 1908 — Section 89A ↑
- বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের বিধান The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974-এ রয়েছে। আর পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৪-এ বিবাহের মোহর/দেনমোহর স্ত্রীকে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 | কুরআন ৪:৪ ↑
- সহিহ আল-বুখারি ৫১৩৩ — আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে নবীজি ﷺ তাঁকে ছয় বছর বয়সে বিবাহ করেন, নয় বছর বয়সে তাঁর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু হয় এবং তিনি নয় বছর নবীজি ﷺ-এর সঙ্গে ছিলেন। সহিহ আল-বুখারি ৫১৩৩ ↑
- পবিত্র কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৭ — পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও নির্ধারিত অংশ রয়েছে। উত্তরাধিকারীদের অংশের বিস্তারিত বিধান সূরা আন-নিসা ৪:১১–১২-এ এসেছে। কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৭–১১ ↑
একটি আহ্বান
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, কবি কালাম আজাদের হৃদয়ছোঁয়া গল্প “আসমা” ভালো লাগলে আপনার বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না। হয়তো এই গল্পটি আপনাকে নতুন করে ভাবাবে—ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা, ক্ষমা আর সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য নিয়ে।__আমার বাংলা পোস্ট.কম।

